অনলাইনে গরু কেনার ধুম

অনলাইনে কোরবানির পশু বেচা-কেনা! এই নিয়ে ট্রল, হাসি-তামাশাকে পাশ কাটিয়ে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানগুলো সাফল্যের দেখা পাচ্ছে।

 

এবারের কোরবানি ঈদে ভার্চুয়াল এই ছোট হাটে বিক্রির পরিমাণ আগের বছরগুলোর তুলনায় বেশি বলে জানিয়েছে দেশে প্রথম অনলাইনে কোরবানির গরু বিক্রি শুরু করা প্রতিষ্ঠান আমারদেশ ই-শপ। মাংস বিক্রির চেইনশপ বেঙ্গল মিট জানিয়েছে গতবারের ঈদ-উল-আজহার চেয়ে এবার অনলাইনে নিজেদের গরু বিক্রির পরিমাণ প্রায় ৪ গুণ বেড়েছে।

অনলাইন ভিত্তিক এসব ভার্চুয়াল কোরবানির হাটে গরু বিক্রিকে প্রাধান্য দিচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান। এসব সাইটে ৬০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২ লাখ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে দেশী-বিদেশী জাতের গরু।

২০০৯ সালে দেশে প্রথমবার অনলাইনে গরু বিক্রি করা শুরু করা আমারদেশ ই-শপ।এই ই-কমার্স সাইটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সাদেকা হাসান সেজুতি বলেন, ‘আমাদের সাইট সরাসরি গ্রামের গৃহস্থ-গরুর খামারির সঙ্গে কোরবানিদাতার সংযোগ তৈরি করে। অর্ডার চূড়ান্ত হওয়ার পর গরু পালনকারী নিজে গ্রাহকের বাড়িতে পৌঁছে দেন। এবার কিশোরগঞ্জের ২’শ জনেরও বেশি গরু পালনকারী আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। আশা করছি এবার তাদের ১৫০-২০০ টি গরু আমারদেশ ই-শপে বিক্রি হবে।’

তিনি আরও জানান,‘এখন পর্যন্ত আমাদের সাইটে অর্ধশতাধিক গরু বুকিং দেয়া হয়েছে। অন্যান্য পণ্যে আমরা গ্রাহকদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ মুনাফা রাখলেও কোরবানির গরুতে গ্রাহকের কাছ থেকে আমরা কোনো মুনাফা রাখছি না। দেশের প্রতি জেলায় আমারদেশ ই-শপের স্থানীয় সেন্টার রয়েছে। সেন্টারগুলোতে গরু কোরবানির উপযোগি কিনা তা স্থানীয় পশু চিকিৎসক ও ইমামকে দিয়ে যাচাই করেই অনলাইনে বিক্রির জন্য তোলা হয়।’

পাবনায় নিজেদের ফার্মে উৎপাদিত কোরবানির গরু অনলাইনে বিক্রি করে বেঙ্গল মিট।কোরবানির জন্য জীবন্ত গরু বিক্রির পাশাপাশি জবাই করা গরুর মাংস কোরবানিদাতার বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থাও চালু আছে এই প্রতিষ্ঠানে।

বেঙ্গল মিটের এবারের অনলাইন কোরবানির গরু বেচা-কেনার চিত্র তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির বিপণন প্রধান এইচইউএম মেহেদি সাজ্জাদ।

তিনি বলেন,‘ গতবার আমরা ১০০ টি জীবন্ত এবং জবাই করে মাংস প্রস্তুত করা ৫০ টি গরু বিক্রি করেছিলাম। এবার সব মিলিয়ে আমরা প্রায় ৫০০ টি গরু বিক্রি করেছি। এখন জবাইয়ের পর মাংস বানিয়ে কোরবানিদাতার বাড়িতে দেয়ার মত ১৩ টি গরু বাকী আছে। আমাদের সাইটে পাবনা ব্রিডসহ দেশীয় জাতের লাল রঙের গরুই বেশি।’

অনলাইন কোরবানির হাটে ক্রেতাদের আস্থা-অনাস্থা

প্রবাসী থেকে শুরু করে হাঁটে যাওয়ার ঝুট-ঝামেলা মুক্ত থাকতে চাওয়া ক্রেতাদের কাছে অনলাইনে কোরবানির গরু কেনা জনপ্রিয় হচ্ছে। তবে কিছু সংশয় তো আছেই। অনলাইন শপিংয়ে অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, স্মার্টফোন-কম্পিউটারের স্ক্রিনে দেখা পণ্য আর হাতে পাওয়া পণ্যের মধ্যে অনেক সময়ই মিল থাকে না।

দেশের অনলাইন শপিংয়ের এই অবস্থাতেও অনলাইনে কোরবানির গরু কিনতে পাচ্ছেন ভরসা ক্রেতারা।

গত ঈদে বেঙ্গল মিটের সাইট থেকে অনলাইনে কোরবানির গরু কিনেছিলেন রাজধানীর আজিমপুর পিলখানা এলাকার এক নারী ক্রেতা।

জবাইয়ের পর মাংস প্রস্তুত করা গরু কেনার অভিজ্ঞতার তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সবমিলিয়ে অনলাইনে কোরবানির গরু কেনাটা আমার জন্য বেশ সুবিধাজনক ছিলো। তবে কোরবানির পর মাংস প্রস্তুত করতে আরও কম সময় নিলে ভালো হতো। ঈদের দিনেই এই মাংস বাসায় পৌঁছে দিলে সবচেয়ে ভালো হয়।’

অনলাইনে দেয়া গরুকে অনেকটা হাটের মতোই খুঁটিয়ে দেখার সুবিধা চান অনেক ক্রেতা।

রাজধানীর লালবাগের একজন ক্রেতা বলেন,‘সাইটগুলোতে গরুকে চারপাশ থেকে দেখার জন্য ৩৬০ ডিগ্রি দৃশ্যায়ন করে এমন ছবি দেয়া উচিৎ।’

ক্রেতাদের ভরসার অর্জনে একটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আমারদেশ ই-শপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সেজুতি বলেন,‘আমাদের প্রথম ক্রেতা ছিলেন নেদারল্যান্ডস প্রবাসী একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি দেশে এসে আমাদের সাইট থেকে একটি গরু অর্ডার করেন। গরুটি তার বাসায় পাঠানোর পর তিনি নেবেন না জানালেন। কারণ গরুটি তার কাছে ছোট মনে হয়েছে এবং দুই মণ মাংস কিছুতেই হবে না বলে ধারণা তার। গরুপালনকারী তাকে বোঝাতে পেরেছিলেন দেশী গরুগুলো এরকম চাপা হয়। ঈদের দিন জবাইয়ের পর দেখা যায় ২ মণ মাংসই হয়েছে।’

আমারদেশ ই-শপ, বেঙ্গল মিট ছাড়াও কয়েক বছর ধরে অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রি করছে সাদেক অ্যাগ্রো, বিক্রয় ডটকম, , ক্লিকবিডি ডটকমসহ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। পেশাদার অনলাইন বাজারগুলোর (ই-কমার্স সাইট) পাশাপাশি ঈদকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি ‘কোরবানির হাট’। এসব সাইটে কোরবানির পশুর পাশাপাশি কোরবানি পশু জবাইয়ের বিভিন্ন সরঞ্জামাদিও বিক্রি করা হচ্ছে।

Facebook Comments