আজ সমাহিত করা হবে নায়ক রাজ কে

বৃষ্টিস্নাত সকাল থেকেই অসংখ্য মানুষ তাঁর অপেক্ষায়। চোখে জল, হাতে ভালোবাসার ফুল নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসছে ভক্ত-অনুরাগীরা।

একে একে আসে রুপালি পর্দার নায়করাজের অনেক সহকর্মীসহ অভিনেতা-অভিনেত্রী, রাজনীতিকসহ শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের অসংখ্য মানুষ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে আনা হয় নায়করাজের মরদেহ। কফিন রাখা হয় গগনশিরীষ গাছের নিচে। কালো কাপড়ে তৈরি করা হয়েছিল অস্থায়ী মঞ্চ। কফিনের ভেতর মুদিত নয়নে শুয়ে আছেন তিনি। তাঁকে ঘিরে ভিড় থাকলেও নেই কোনো কোলাহল। এক অসীম শূন্যতা ঘিরে আছে সবাইকে। ভক্ত-অনুরাগী ও সুহৃদের অনেকেরই হাতে ফুল, চোখে জল।

এর আগে সকাল ১১টার দিকে শেষবারের মতো এফডিসিতে নিয়ে যাওয়া হয় নায়করাজের মরদেহ।

সঙ্গে ছিলেন তাঁর দুই ছেলে বাপ্পারাজ ও সম্রাট। লাশবাহী গাড়ির খোলা দরজার ফাঁক দিয়েই শেষবারের মতো সবাই দেখে নায়করাজকে। এরপর একে একে শ্রদ্ধা জানায় বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি। আজ বুধবার ভোরে রাজ্জাকের মেজ ছেলে রওশন হোসেন বাপ্পির দেশে ফেরার  কথা রয়েছে। এরপর সকাল ১০টায় বনানী কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হবে। এর আগ পর্যন্ত তাঁর মরদেহ রাখা হবে ইউনাইটেড হাসপাতালের হিমঘরে। গতকাল সকালে হাসপাতাল থেকে প্রথমে শিল্পীর শবদেহ নিয়ে আসা হয় তাঁর গুলশানের বাসভবন লক্ষ্মীকুঞ্জে। পরিবারের সদস্যরা চোখের জলে বিদায় জানান নায়করাজকে। সেখান থেকে বেলা ১১টায় নিয়ে আসা হয় এফডিসিতে। এখানে চলচ্চিত্রশিল্পীদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জানাজা।   এরপর সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শিল্পীর মরদেহ রাখা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে।   সেখান থেকে শবদেহ নিয়ে যাওয়া হয় গুলশানের আজাদ মসজিদে। এখানে বাদ আসর অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় দফা জানাজা।   এফডিসিতে ভালোবাসায় সিক্ত : এফডিসিতেই গত বছর নিজের ৭৫তম জন্মদিনের আয়োজনে এসে রাজ্জাক বলেছিলেন, ‘শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত আমি এফডিসির হয়েই থাকব। ’ নিজের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় আঙিনা এফডিসিতে রাজ্জাকের শবদেহ আনা হলে অনেকেই ধরে রাখতে পারেনি চোখের জল।

সেখানে নায়করাজকে শ্রদ্ধা জানান তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, গীতিকবি গাজী মাজহারুল আনোয়ার, অভিনয়শিল্পী আলমগীর, কবরী, সুচন্দা, ববিতা, চম্পা, শাবনূর, শাকিব খান, ফেরদৌস, আমিন খান, রুবেল, আহমেদ শরীফ, ওমর সানী, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি অভিনেতা মিশা সওদাগর, চলচ্চিত্র পরিচালক মনতাজুর রহমান আকবর, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ম হামিদ, চলচ্চিত্র পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম প্রমুখ। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জানায় তথ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি), বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি, চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতি, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিবার, সিনেম্যাক্স মুভি পরিবার, বাংলাদেশ আওয়ামী সাংস্কৃতিক লীগ, বাংলাদেশ ফিল্ম ক্লাব, চলচ্চিত্র গ্রাহক সংস্থা, চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি, সিনে স্থির চিত্রগ্রাহক সমিতি, জাসাসসহ বিভিন্ন সংগঠন।   প্রিয় অভিনেতাকে শ্রদ্ধা জানানোর পর সেখানেই তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় নায়করাজের বড় ছেলে বাপ্পারাজ বলেন, ‘আমার আব্বা জীবনের পুরোটা সময় আপনাদের সঙ্গে কাজ করেছেন, এর মধ্যে যদি কারো সঙ্গে কোনো লেনদেন থেকে থাকে, তাহলে আমার বা আমার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। ’

তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘রাজ্জাকের নেতৃত্বেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প। এ দেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য তিনি কাজ করেছেন ও ভেবেছেন। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমেই তিনি এ দেশের সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করেছেন। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সাংস্কৃতিকচর্চার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অভিভাবকের ভূমিকা রেখেছেন রাজ্জাক। তাই আমরা সরকারিভাবে তাঁর কর্মকাণ্ডকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করব, যাতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তাঁর কর্মময় জীবন থেকে শিক্ষা নিতে পারে। ’

নায়িকা সুচন্দা বলেন, ‘রাজ্জাক নায়কের মতো রুপালি পর্দায় এসেছিলেন। তাঁর চলে যাওয়াটাও নায়কের মতোই। তিনি কখনো কারো কাছে ছোট হননি। বাস্তব জীবনেও তিনি মহানায়ক ছিলেন। ’ ববিতা বলেন, ‘আমার জীবনের ব্যবসাসফল ও ভালো ছবিগুলো রাজ্জাকের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছি। রাজ্জাকের পর্দা উপস্থিতিটাই ছিল ভিন্ন রকমের। এমন অভিব্যক্তিময় চিত্রনায়কের দেখা সহজে মেলে না। এ কারণে এখনকার নায়করাও তাঁকে অনুসরণ করে। ’ আলমগীর বলেন, ‘একজন সন্তান পিতাকে হারালে যেমন কষ্ট পায়, আমি তেমনই কষ্ট পাচ্ছি। ’ গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ‘রাজ্জাক ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল, এ দেশের চলচ্চিত্র বিশ্ব দরবারে স্থান করে নেবে। এটা হলেই তাঁর স্বপ্ন সার্থক হবে, আত্মা শান্তি পাবে। ’ চম্পা বলেন, ‘ওনার সঙ্গে খুব কম ছবিতেই কাজ করেছি। তবে ওনার মতো অভিভাবক আমরা আর পাব কি না জানি না। ’ শাবনূর বলেন, ‘পর্দার নায়করাজের চেয়ে পর্দার পেছনের রাজ্জাক আমার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ’ শাকিব খান বলেন, ‘বর্তমান প্রজন্ম এবং আগামী যত প্রজন্ম আসবে তাদের কাছে নায়করাজ প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। আমরা আমাদের একজন আইডল হারালাম। ’ ওমর সানী বলেন, ‘তাঁর আরো অনেক কিছু দেওয়ার ছিল। তবে নিজের কর্মের মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে আজীবন বেঁচে থাকবেন। ’ রুবেল বলেন, ‘রাজ্জাক ভাই এমন একজন মানুষ ছিলেন, যাঁর অভাব পূরণ হওয়ার নয়। ’

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি : দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে আসে শিল্পীর শবদেহ। ততক্ষণে পুরো শহীদ মিনার এলাকা লোকে লোকারণ্য। দুই ঘণ্টা ব্যাপ্তির শ্রদ্ধাঞ্জলি পর্ব শেষ হয় ৪০ মিনিটে। পুরোটা সময় মরদেহের পাশে ছিলেন দুই ছেলে বাপ্পারাজ ও সম্রাট, চিত্রনায়ক জাভেদ ও শাকিব খান, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হাসান ইমাম, জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ প্রমুখ।

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল। ব্যক্তিপর্যায়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বিএনপির পক্ষে শ্রদ্ধা জানান দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানসহ আরো অনেকে।

প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘দীর্ঘ পাঁচ দশক তিনি আমাদের চলচ্চিত্রে অবদান রেখেছেন। রাজ্জাক ছিলেন এ বাংলার উত্তম কুমার।’ সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলা ছবি নির্মাণের ইতিহাস দেখলে বলতে হয়, যে ব্যক্তির ওপর বাংলা চলচ্চিত্র দাঁড়িয়ে ছিল তিনি রাজ্জাক। নিজের দক্ষতা, নিজের গুণে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তিনি আমাদের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন। আজ বাংলা চলচ্চিত্রের প্রধান স্থপতি চলে গেলেন। ’ সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, ‘রাজ্জাকের বিনয়ের প্রেমে পড়েনি এমন মানুষ বোধ হয় নাই। এত জনপ্রিয় মানুষ হয়েও সে তার অতীতকে ভোলেনি। সিনিয়রদের সম্মান করা ছিল তার স্বভাবগত ব্যাপার। সে সব শ্রেণির মানুষকে শ্রদ্ধা করত। ’ নাট্যজন আতাউর রহমান বলেন, “আমি ওর চেয়ে বয়সে মাত্র এক বছরের বড়। কিন্তু আমাদের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। সে আমার ‘রক্তকরবী’ নাটক দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিল। যখনই দেখা হতো, আমরা আড্ডায় মেতে উঠতাম। ” অভিনেত্রী জয়া আহসান বলেন, ‘উনার বাচনভঙ্গি থেকে শুরু করে সব কিছু দারুণ মার্জিত। এ রকম পারফেক্ট একটা মানুষকে হিরো হিসেবে দেখি না এখন। তাঁর চলে যাওয়ায় এই জায়গাটা আর কখনো হয়তো পূরণ হবে না। ’

রোজিনা বলেন, “আমার জীবনের প্রথম ছবি ‘আয়না’য় নায়ক হিসেবে পেয়েছিলাম রাজ্জাককে। তাঁর সঙ্গে অভিনয় করতে গিয়ে আমার হাত-পা কাঁপছিল। সেটা বুঝে তিনি আমাকে সাহস দিয়েছিলেন। অভিনয়ের অনেক কিছু শিখেছি তাঁর কাছে। ”

এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিকভাবে  শ্রদ্ধা জানায়  বাংলা  একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি, অভিনয় শিল্পী সংঘ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, এনটিভি, গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, ঋষিজ, বাংলাদেশ টেলিভিশন, ওয়ার্কার্স পার্টি, দৃষ্টিপাত নাট্য সংসদ, মুক্তধারা সাংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্র, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, বাউল একাডেমি ফাউন্ডেশন, যুব সমিতি, সুবচন নাট্য সংসদ, দনিয়া সাংস্কৃতিক জোট, ডিরেক্টরস গিল্ড, এনটিভি, দেশ টিভি, প্রজন্ম ৭১, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটি ইত্যাদি।

বাংলাদেশের কিংবদন্তি নায়করাজ রাজ্জাকের মৃত্যুতে গোটা চলচ্চিত্রশিল্প শোকে বিহ্বল। যে যাঁর অবস্থান থেকে ব্যক্তিগতভাবে শোক প্রকাশ করছেন; প্রিয় নায়কের স্মৃতি রোমন্থন করছেন। এদিকে, তাঁর মৃত্যুর খবর এরই মধ্যে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে পৌঁছে গেছে ওপার বাংলাতে। খবরটি চোখ এড়ায়নি টালিগঞ্জের জনপ্রিয় নায়ক প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের। রাজ্জাকের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে এক আবেগঘন স্ট্যাটাসসহ ছবি শেয়ার করেন।

রাত ৯টার সময় পোস্ট করা স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, ‘যাঁদের সঙ্গে আমি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি, তাঁদের মধ্যে তিনি আমার কাছে পিতৃতুল্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে থাকবেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু শুধু চলচ্চিত্রশিল্পকে শূন্য করেনি, আমার হৃদয়কেও করেছে। তাঁর মৃত্যুর খবরে আমার হৃদয় ব্যথা পেয়েছে। শান্তিতে থাকুন স্বর্গে রাজ্জাক সাহেব।’

রাজ্জাক পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু চলচ্চিত্রে প্রসেনজিতের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। রাজ্জাক সেসব ছবিতে প্রসেনজিতের পিতার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘কুরুক্ষেত্র’, ‘বাবা কেন চাকার’, ‘সন্তান যখন শত্রু’, ‘স্নেহের প্রতিদান’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র।

২১ আগস্ট সোমবার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ঢাকা ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র নায়করাজ রাজ্জাক।

Facebook Comments