‘আর কত বয়স হইলে মুই ভাতা পামু ?’ আক্ষেপ দীপালি রানির

বিধবা দীপালির এখন বার্ধক্যের ক্রান্তিকাল। জীবনের এই ক্রান্তিলগ্নে স্বজন বলতে তাঁর কেউ নেই।

২৫ বছর আগে দরিদ্র স্বামী যতীন সমদ্দার মারা যান। এরপর পালাক্রমে আট সন্তানের মৃত্যু বৃদ্ধ দীপালিকে আরো অসহায় করে তোলে। একমাত্র মেয়ে বেঁচে থেকেও নেই। স্বামীর সঙ্গে দেশ ছেড়ে আন্দামানে বসতি গড়েছেন। বছর দুয়েক আগে প্রতিবেশীর মোবাইল ফোনে মেয়ের সঙ্গে একবার কথা হয়েছিল। এরপর তাঁর আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। এখন সহায় সম্বলহীন দীপালির তালাশ নেওয়ার মতো জগৎ-সংসারে আর কেউ রইল না। সরকারের বিধবা ভাতা কিংবা বয়স্ক ভাতা কোনো তালিকায়ই হতদরিদ্র এ বিধবার নাম ওঠেনি।

এমন সংকটময় জীবনে ৭৫ বছরের এ বৃদ্ধার ভিক্ষা করে জীবিকা চালানোর কথা। কিন্তু অসহায় বিধবা তা করেননি। ভিক্ষাবৃত্তিকে অসম্মানের মনে করেন এই বৃদ্ধা। তাই প্রতিদিন চকোলেট ও বিস্কুট নিয়ে পথের দোকানি। চকোলেট বিক্রির আয়েই তাঁর দুই বেলা দুই মুঠো ভাতের সংস্থান হয়। পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার ভাণ্ডারিয়া পৌর শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীপুরা মহল্লার বাসিন্দা দীপালি রানী। তাঁর আক্ষেপ, ‘আর কত বয়স অইলে সরকার মোরে ভাতা দেবে? মুই কি কোনো ভাতা পামুনা?’

বর্তমান সরকার মাসিক ৫০০ টাকা হারে প্রবীণ দরিদ্র, অসহায় নর-নারীর জন্য বয়স্ক, বিধবা ভাতাসহ বিভিন্ন ভাতা চালু করেছে। কিন্তু কিছু অব্যবস্থাপনার জন্য এসব হতদরিদ্র অসহায় নর-নারী ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিধবা দীপালি জানান, তাঁর স্বামী যতিন সমদ্দার দুরারোগ্য অসুখে ভুগে ২৫ বছর আগে মারা গেছেন। এরপর চোখের সামনে একে একে তাঁর আট সন্তানের মৃত্যু। শ্যামলী নামের একটি মেয়ে ছিল তাঁর। সেও একযুগ আগে স্বামীর সঙ্গে চলে গেছে কোথায়, কেউ জানে না।

দীপালি ভাণ্ডারিয়ার ৬৮ নম্বর হাই স্কুলসংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে বসে চকোলেট ও বিস্কুট বিক্রি করেন। এতে ২০-৩০ টাকা যা আয় হয়, তা দিয়ে তাঁর খাবারই হয় না। এর ওপর আবার নিজের ওষুুধ, কুপির তেল ইত্যাদি কিনবে কোত্থেকে? বিদ্যালয় বন্ধ থাকলে তো তিনি আরো বেশি সমস্যায় পড়েন। প্রথম দিকে তাঁকে বিদ্যালয়ের চত্বরে ঢুকতে বাধা দেওয়া হতো। পরে প্রধান শিক্ষক সজল কুমার বৃদ্ধার অসহায়ত্বের কথা জানতে পেরে তাঁকে বিদ্যালয় চত্বরের গাছের নিচে চকোলেট-বিস্কুট বিক্রির অনুমতি দেন। বিধবা ভাতা এবং বয়স্ক ভাতার জন্য তিনি কয়েক বছর এলাকার মেম্বারের পেছনে পেছনে ঘুরেছেন। এলাকার বিভিন্ন নেতার কাছে বহু নিবেদন করেও সরকারি কোনো ভাতা তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। তাই দীপালি আক্ষেপ করে বলেন, ‘দুই মুঠ খাইয়া তো বাইচ্চা থাকতে অইব। হের লাগি এই চকোলেট, বিস্কুট বেচি। বাবারে অহন আর শরীরে কুলায় না। কি আর করমু। আইজ পর্যন্ত সরকার মোরে কোনো ভাতাও দিল না। মুই কি মরার আগে কোনো ভাতা পামু না!’

এ ব্যাপারে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘ওই বৃদ্ধা খুব অসহায়। তবে একবার তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। জাতীয় পরিচয়পত্র ও দুই কপি ছবি পেলে পরে ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। ’ ভাণ্ডারিয়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মিজান সালাউদ্দিন বলেন, ‘দীপালি রানীর কোনো আবেদন সমাজসেবা অফিসে পাওয়া যায়নি। তবে আবেদন করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

Facebook Comments