একটি দুর্ঘটনা- সারা জীবনের কান্না

ঈদ এলেই একটা সাধারণ আতঙ্ক কাজ করে। এবার গণমাধ্যমে না জানি সড়ক দুর্ঘটনায় কতজনের প্রাণহানীর খবর পড়তে হয়!

এই আতঙ্কটা কাজ করার পেছনে প্রধান কারণ মানুষের অসাবধানতা আর অসচেতনতা।

এ মানুষের মধ্যে প্রথমেই পড়েন গাড়িচালক। এ সময় সবাই চান প্রিয়জনদের সাথে ঈদ করতে। তাই শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে ছোটেন। যেভাবেই হোক বাড়ি পৌঁছুতে হবে। ঘরমুখো মানুষের ভিড় লেগে থাকে বাস কাউন্টারে। বাসের টিকিট পাওয়া যেন সোনার হরিণ পাওয়ার আনন্দ। আর যারা টিকিট না পায়, তারা? তাদেরও তো ইচ্ছে করে প্রিয়জনদের পাশে থাকার। কিন্তু উপায় যখন থাকে না তখন? তখন যে কোনো উপায়ে পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত নেন। আর এই সুযোগটা নেয় ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো। এসব গাড়ি সড়কে নামানো কোনো ব্যাপারই না, বিশেষ করে এই সময়টায়। ঘুষের পরিমাণটা বাড়িয়ে দিলেই হল, চিন্তার কোনো কারণ থাকে না গাড়িচালকদের। গাড়ির ভেতরে আর ছাদে যাত্রী নিয়ে ছুটে চলে। আর তাতেই ঘটে বিপত্তি। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে। রাতের বেলায় এ ধরনের গাড়ি বেশি চলে। রাতে সুবিধা হল রাস্তায় ট্রাফিকের ধকল বেশি সহ্য করতে হয় না।
আবার এমনও হয় গাড়ির ফিটনেসে কোনো সমস্যা নেই, সব ঠিক আছে। কিন্তু সময় একটা বড় বিষয়। কত দ্রুত গন্তব্যে পৌছানো যায় তাতে বাড়তি আয়ের পথ সুগম হবে। দ্রুত পৌঁছে আবার ফিরতি পথে চলা শুরু করবে। এর ফলে নির্দিষ্ট গতিবেগের চাইতে বেশি গতিতে গাড়ি চালান চালকেরা। আর তাতেই দুর্ঘটনায় পড়ে গাড়িগুলো। ঘটে প্রাণহানী।

আরেকটি বিষয়, একজন গাড়িচালক কত ঘন্টা ড্রাইভিং সিটে বসতে পারেন। তার কোনো হিসেব থাকে না। টাকা কামানোর আশায় চোখে ঘুম নিয়ে ক্লান্ত শরীরে গাড়ি চালায় অনেকে। আর তাতেই ঘটে বিপত্তি, দুর্ঘটনা।

এবার অন্য মানুষ প্রসঙ্গে। যাত্রী সাধারণ যারা, তাদেরও কিছুটা সচেতনতা বা দায়িত্ববোধ থাকা উচিত। অবশ্যই তাদের প্রিয়জনদের সাথে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করাকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখছি না। তারা যাবেন মা বাবা ভাই বোন ছেলেমেয়েদের সাথে ঈদ করতে। কিন্তু গাড়ির অতিরিক্ত যাত্রী হতে হবে কেন তাকে? কেন একটি গাড়ির ফিটনেস সনদ আছে কি নেই তা না জেনে উঠে পড়বেন? গাড়িচালকের গাড়ি চালানোর সনদ আছে কি নেই তা জানবেন না কেন?

ঈদের আনন্দ উপভোগ করার অধিকার আছে সবার। সে জন্য যারা পরিবহন খাতের সাথে জড়িত তারা একটু সচেতন হলে অনেক দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। তারা যদি বেশি টাকা কামানোর কথা না ভেবে নিরাপদে যাত্রীদের এই ঈদের সময়টায় গন্তব্যে পৌছানোর ব্যবস্থা করেন তা হলেই প্রিয়জনদের সাথে সবাই ঈদ আনন্দ উপভোগ করতে পারেন। কোনো বিষাদে ছেয়ে যাবে না ঈদ।
আরেকটি বিষয় খুবই কষ্টের। নিম্ন আয়ের মানুষ যারা, বিশেষ করে দিনমজুর, রিক্সাচালক, ভ্যানচালক বা ঢাকা শহরে ফুটপাতে কাপড়চোপর বিক্রি করেন, তারা ঈদের আগের রাতে বাড়িতে যেতে চান যেকোনো উপায়ে। তখন তারা যেকোনো পরিবহন পেলেই উঠে পড়েন। সেটা আসলে কতটুকু নিরাপদ সেটা যাচাই করার সময় তাদের থাকে না, বা হয়ত বিবেক-বিবেচনা বোধও কাজ করে না সেই সময়টায়। তাই তো উঠে পড়েন সিমেন্ট বোঝাই ট্রাকের ওপর, পাথর বোঝাই ট্রাকের যাত্রী হয়ে। মহাসড়কে ছুটে চলে পরিবহন ক্ষমতার বেশি ওজনের সেই ট্রাক। আর একটু অসাবধানতার কারণে ট্রাক উল্টে ঘটে প্রাণহানী। মাটি হয়ে যায় প্রিয়জনদের সাথে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগির করার স্বপ্ন। শোকের ছায়া নেমে আসে কত না বাড়িতে। ঈদের ছুটির পর পত্রিকায় বড় করে শিরোনাম ছাপা হয়- ‘সিমেন্ট বোঝাই ট্রাক উল্টে নিহত চৌদ্দ।’

আমাদের মহাসড়কে ট্রাফিক পুলিশের যেসব সদস্য কর্তব্যরত থাকেন, তারা যদি ঈদের আগের রাতের বেলা যেসব মালবাহী ট্রাক চলাচল করে সেগুলো একটু থামিয়ে তদারকি করেন তা হলে কিছু মানুষ দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে পারেন। ঈদের আনন্দ মাটি হওয়া থেকে কিছু পরিবার রক্ষা পেতে পারে।

সব মিলিয়ে যাত্রী, গাড়িচালক, পরিবহন খাতের নেতা এবং ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যদের একটু সচেতনতা পারে সড়ক দুর্ঘটনা থেকে মানুষকে রক্ষা করতে। ‘আমরা যেন গাড়ির অতিরিক্ত যাত্রী না হই। আমরা যেন ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে না নামাই। আমরা ক্লান্ত হয়ে ঘুমচোখে গাড়ি যেন না চালাই। মালবাহী ট্রাকে যাত্রী দেখামাত্র তাদেরকে নামিয়ে দিব। আমরা কোনো অবস্থায় গাড়ির গতি নির্দিষ্ট গতির চেয়ে বাড়াবো না।’

এই শপথগুলো কি আমরা মেনে চলতে পারি না?

# সংগ্রহীত 

Facebook Comments