চট্টগ্রামে নালা থেকে নবজাতক শিশুকে উদ্ধার করলেন দুই ভিক্ষুক

প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে মেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রামের প্রবর্তক মোড়ে আসেন পঞ্চাশোর্ধ্ব আরিফা খাতুন। ভিক্ষা করেই দিন কাটে তাঁর। গতকাল রোববারও সকাল ছয়টার দিকে প্রবর্তক মোড়ের ফাঁকা ফুটপাতে হাঁটছিলেন তিনি। হঠাৎ নালার ভেতরে একটি কাগজের কার্টন দেখে কৌতূহল হয় তাঁর।

 

কার্টনটি তোলেন তিনি। খোলার পর দেখেন এর ভেতরে নবজাতক! দূরে দাঁড়ানো মেয়েকে চিৎকার করে ডাকতে থাকেন তিনি। শিশুটি জীবিত টের পেয়েই ওম দিতে বুকে জড়িয়ে ধরেন মেয়ে মনোয়ারা খাতুন (৩৫)। এরপর দুপুর ১২টার দিকে মা-মেয়ে শিশুটিকে নিয়ে যান পাঁচলাইশ থানায়।

পৃথিবীর আলো দেখার পর মায়ের কোল পায়নি ছেলেশিশুটি। তার ঠাঁই হয় নালায়। শিশুটির কোনো পরিচয় বের করতে না পেরে আদালতের দ্বারস্থ হয় পুলিশ। আদালত নবজাতকটিকে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে পাঁচলাইশ থানার পুলিশকে শিশুটির অভিভাবকদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন।

এর আগে গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে নগরের কর্নেলহাট এলাকার ডাস্টবিনে পাওয়া যায় এক শিশুকে। উদ্ধারের পর থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে ছিল সে। একুশের প্রথম প্রহরের কিছুক্ষণ আগে শিশুটিকে উদ্ধার করার কারণে তার নাম রাখা হয় ‘একুশ’। শিশুটিকে সন্তান হিসেবে লালন-পালন করতে ১৬ জন নারী আবেদন করেছিলেন। গত ২৯ মার্চ আদালত শিশুটিকে লালন-পালনের জন্য এক দম্পতির জিম্মায় দেন।

গতকাল নালায় পাওয়া শিশুটি এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক বিভাগে আছে। ওই বিভাগের প্রধান জগদীশ চন্দ্র দাশ গতকাল রাতে বলেন, এক দিন বয়সী শিশুটিকে নবজাতক ওয়ার্ডের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শিশুটি সুস্থ রয়েছে। তবে ওজন একটু কম।

আরিফা খাতুন মেয়ে মনোয়ারাকে নিয়ে থাকেন নগরের পাহাড়তলী এলাকায়। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত নগরের প্রবর্তক মোড়ের পাশের বদনা শাহ মাজার এলাকায় ভিক্ষা করেন তাঁরা। আরিফা খাতুন বলেন, ফুটফুটে একটা শিশুকে কীভাবে পারল নালায় ফেলে দিতে! শিশুটিকে উদ্ধার করে প্রথমে নিজেদের কাছে রেখেছিলেন। পরে শিশুচোর ভেবে পুলিশ কিংবা লোকজন মারধর করতে পারে—এই ভয়ে থানায় চলে যান। পুলিশ হয়তো শিশুটির মা-বাবাকে খুঁজে বের করতে পারবে।

পাঁচলাইশ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ ওয়ালী উদ্দিন আকবর বলেন, হাসপাতালে শিশুটির নিরাপত্তায় পুলিশি পাহারা রয়েছে। শিশুটিকে কে বা কারা নালায় ফেলে দিয়েছে, তা তদন্ত করা হচ্ছে। প্রকৃত অভিভাবককে খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হবে।

গতকাল বিকেলে আদালত প্রাঙ্গণে দেখা যায়, শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে আদর করছেন মনোয়ারা। তিনি বলেন, বিয়ের পর তাঁকে ফেলে স্বামী চলে যান। এরপর থেকে মায়ের সঙ্গে ভিক্ষা করেন তিনি। শিশুটিকে পেলে মায়ের আদর দিয়ে বড় করবেন তিনি।

আরিফা খাতুন বলেন, ‘শিশুটিকে আমরা পাই বা না পাই, যত দিন আদালত কারও জিম্মায় না দেবেন, তত দিন মায়ের স্নেহ দিয়ে যাব।’

Facebook Comments