জরায়ুমুখের ক্যানসার ও ভাইরাস

বাংলাদেশে নারীদের স্তন ক্যানসারের পরই জরায়ুমুখের ক্যানসারে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। এই অসুখের অন্যতম কারণ একধরনের ভাইরাসের সংক্রমণ, নাম হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস বা এইচপিভি। এ সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নিন:

১.  এইচপিভির শতাধিক প্রজাতি আছে। এর মধ্যে ১৩টি জরায়ুমুখ ক্যানসারের জন্য দায়ী।

২. এই সংক্রমণ ছোঁয়াচে। পৃথিবীতে প্রতি ১০ জন নারী-পুরুষের মধ্যে নয়জনই জীবনে অন্তত একবার হলেও এইচপিভি সংক্রমিত হন।

৩. এই ভাইরাস সংক্রমিত হলেই যে ক্যানসার হবে, তা নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দিয়ে এইচপিভির মোকাবিলা করতে পারেন।

৪. অল্প বয়সে যৌনকাজ, নারী-পুরুষের বহুগামিতা এই সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

৫. এই ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে যৌনকাজের আগে এইচিপিভির টিকা নিতে হবে।

৬. যৌন সংসর্গের সময় কনডম বা প্রতিরোধক ব্যবহার করেও ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।

৭. টিকা নেওয়ার পরও প্রত্যেক নারীর (যৌনক্রিয়া শুরু হওয়ার পর) ২১ বছর বয়স থেকে তিন বছর পরপর প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট করে জরায়ুমুখের ক্যানসার হয়েছে কি না জেনে নিতে হবে।

৮. প্রায় প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্ক্রিনিং পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। এতে কোনো অস্বাভাবিকতা মিললে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

দেশে প্রতিবছর ১২ হাজার নারী জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। আর এ রোগে মারা যায় প্রায় সাড়ে ৬ হাজার নারী। তবে এই রোগ প্রতিরোধযোগ্য। প্রতিরোধে দরকার নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার সচেতনতা ও চিকিৎসা।

আজ মঙ্গলবার সকালে ‘জননীর কাছে সবার আছে জন্মঋণ, জরায়ুমুখের ক্যানসার সচেতনতায় অংশ নিন’ শিরোনামে শোভাযাত্রা শুরুর আগে বক্তারা এসব কথা বলেন। জরায়ুমুখের ক্যানসার সচেতনতা বাড়াতে দ্বিতীয়বারের মতো এর আয়োজন করে জননীর জন্য পদযাত্রা।

এতে বক্তব্য রাখেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য, সহউপাচার্য, প্রক্টর, রেজিস্ট্রারসহ কয়েকজন চিকিৎসক। এ সময় তাঁরা বলেন, বিশ্বে নারীদের ক্যানসারের তালিকায় বাংলাদেশ চতুর্থ স্থানে। আর দেশে এ রোগের প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ। অল্প বয়সে বিয়ে হলে বিবাহিত জীবন দীর্ঘ হয়, সন্তান জন্ম দেওয়ার হার বেড়ে যায়। এতে জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি, পরিবেশের বিপর্যয় ও খাদ্যাভাসও এর জন্য দায়ী।

চিকিৎসকেরা বলছেন, জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হলে মাসিকের রাস্তায় অতিরিক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত সাদা স্রাব যেতে পারে, অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হতে পারে। পাশাপাশি, মাসিকের সময়কাল বেড়ে যেতে পারে বা অনিয়মিত হতে পারে। স্বামী-স্ত্রীর যৌন সম্পর্কের পরে রক্তক্ষরণ বা ব্যথাও হতে পারে।

এ সময় চিকিৎসকেরা বলেন, আশার কথা হচ্ছে, জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধযোগ্য। প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় হলে অল্প চিকিৎসাতেই নিরাময় সম্ভব। তবে এ জন্য প্রয়োজন নিয়মিত জরায়ুর অবস্থা পরীক্ষা করা এবং কিশোরীদের টিকা দেওয়া।

বিএসএমএমইউ-এর উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল হাসান খান বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য জরায়ুমুখের ক্যানসার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, চিকিৎসা দেওয়া ও তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে পুনর্বাসিত করা। এ জন্য পরিবারের পুরুষ সদস্যকে এগিয়ে আসতে হবে। তাঁদের পরিবারের নারী সদস্যদের চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি সহযোগিতা করতে হবে।’

এ শোভাযাত্রার সমন্বয়কারী জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, অনেক নারী লজ্জায় এ রোগের কথা পরিবারে জানান না। এমনকি চিকিৎসকের কাছেও আসেন না। এ সংকোচ ভেঙে তাঁদের চিকিৎসা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, জরায়ু কোনো লজ্জাজনক অঙ্গ নয়, এটা একজন মায়ের অহংকার।

শোভাযাত্রাটি বিএসএমএমইউ-এর সামনে থেকে শুরু হয়ে মিরপুরে শেষ হবে। জানুয়ারি মাস জরায়ুমুখের ক্যানসার সচেতনতার মাস হিসেবে পালনের অংশ হিসেবে এর আয়োজন করা হয়। এতে বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক, শিক্ষক, নার্স, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেন।

ডা. রাহনূমা পারভীন

Facebook Comments
,