থমকে আছে রবিউলের প্রতিবন্ধী স্কুল- সবার সাহায্য কামনা

হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় নিহত গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউলের পরিবার শোককে শক্তিতে পরিণত করে বেঁচে আছে। মা, স্ত্রী, ভাই ও পরিবারের অন্য সদস্যসহ সবাই রবিউলের আত্মত্যাগের জন্য গর্বিত।

প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য নিজ গ্রাম আটিগ্রামে একটি বিশেষায়িত বিদ্যালয় করেছিলেন রবিউল। কিন্তু দেশের জন্য প্রাণ দেওয়ার পর সেই স্বপ্ন থমকে আছে। তাঁর স্বপ্নের স্কুলটিকে এখন পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে চায় পরিবার। এ জন্য সর্বশেষ সামর্থ্যটুকু দিতে দ্বিধা নেই তাদের। আর এ জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ সবার সহযোগিতা চেয়েছে তারা।

কেমন আছে রবিউলের পরিবার? ক্লাস ওয়ানের ছাত্র সাজিদুল করিম সামি। সে যখন থেকে একটু বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই প্রতি রাতে বাবার জন্য অপেক্ষা করত। বাবা বাড়ি ফেরার পর তাঁর সঙ্গে খেলাধুলা দুষ্টুমি করত। পুলিশ অফিসার বাবা রবিউল করিমও ছেলের প্রতিটি আবদার রক্ষা করতেন। সামিকে কোনো দিন ধমক দিতেন না রবিউল।

জঙ্গিদের ছোড়া গ্রেনেডে গত বছর ১ জুলাই শহীদ হন রবিউল। সেই থেকে বাবার সঙ্গে আর দুষ্টুমি করার সুযোগ মেলেনি সামির। বাবার লাশ দেখে সে হয়ে পড়েছিল বাকরুদ্ধ। দেখতে দেখতে চলে গেছে একটি বছর। কিন্তু সামি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেনি। আড়ালে আবডালে সে কাঁদে। তার কান্নায় বুক ভাঙে পরিবারের সদস্যদের। সামির মা উম্মে সালমা জানান, সামির সামনে কেউ তার বাবার কথা তুললে সে সেখান থেকে চলে গিয়ে নীরবে বসে থাকে। দেখেই বোঝা যায় কষ্টে তার বুক ভেঙে যাচ্ছে।

গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় রবিউলের স্ত্রী উম্মে সালমা বলেন, ‘আমি স্বামী হারিয়েছি। আমার সন্তানরা অকালে তাদের বাবাকে হারিয়েছে। এ কষ্ট বলে বোঝানোর নয়। তার পরও যখন ভাবি, আমার স্বামী এবং আমার সন্তানদের বাবা একজন শহীদ তখন সব কষ্ট কমে যায়।   রবিউলের আত্মত্যাগে আমি গর্বিত। রবিউলের স্বপ্ন ছিল প্রতিবন্ধীদের জন্য গড়া স্কুলটিকে আবাসিকে রূপ দেওয়া। রবিউলকে সম্মান জানাতে হলে তার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করি। ’

রবিউলের স্ত্রী উম্মে সালমা বলেন, ‘ছেলে হওয়ার পর একটি মেয়ের খুব শখ ছিল রবিউলের। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হয়েছিল। ওই সময় ডাক্তার জানায়, ছেলে হবে। রবিউল বলছিল মেয়ে হলে ভালো হতো। কিন্তু তার গর্ভে মেয়েই হয়েছে। সেই মেয়েকে দেখে যেতে পারল না রবিউল। সেই সন্তানও দেখতে পারল না বাবার মুখ। ’

উম্মে সালমা বলেন, ‘রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে, তাই তার জন্য গর্ব হয় আমাদের। ’ তিনি আরো বলেন, ‘পুলিশের তরফ থেকে সব সময় আমাদের খোঁজখবর নেওয়া হয়। ’ বর্তমানে উম্মে সালমা তাঁর শাশুড়িকে নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থাকছেন। ছেলে সামি কলতান বিদ্যানিকেতনে ক্লাস ওয়ানে পড়ছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, আটিগ্রামে রবিউল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি বিশেষায়িত বিদ্যালয়। নাম দিয়েছিলেন বিকনিং লাইট অর্গানাইজেশন অব ম্যানকাইন্ড অ্যান্ড সোসাইটি (ব্লুমস)। মা করিমুননেছার দান করা ২৬ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি ৩৫ জন প্রতিবন্ধী শিশু শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে ২০১২ সালের ১ জানুয়ারি। রবিউলের স্বপ্ন ছিল স্কুলটিতে আবাসন ব্যবস্থা করার, যেখানে প্রতিবন্ধী শিশুরা খেলবে, গাইবে, পড়বে। মেধার বিকাশ ঘটিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে।

রবিউলের মা করিমুননেছা বলেন, ‘আমার ছেলে শহীদ হয়েছে। সরকারও তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। শহীদ রবিউলের স্কুল নিয়ে যে স্বপ্ন সরকার নিশ্চয় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ব্যবস্থা নেবে। রবিউলের পরিবার যেন শহীদ পরিবার হিসেবে সম্মান আর সব সুবিধা পায় সে ব্যাপারেও সরকার পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করি। ’

ভাই শামসুজ্জামান শামস বলেন, ‘রবিউল দেশ ও মানুষকে ভালোবাসতেন। জীবন দিয়ে তা প্রমাণ করে গেছেন। ভাই আমাদের অনুপ্রেরণা। আমাদের পুরো পরিবার দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করে যাবে। ’

রবিউল করিমের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ব্লুমস ও এলাকাবাসী। দিনব্যাপী এই কর্মসূচির মধ্যে থাকবে শোকযাত্রা, কবর জিয়ারত ও আলোচনাসভা।

Facebook Comments