দেশসেরা মামা হালিম

বারোটা না বাজলে এ হালিম চুলায় চড়ে না। দিনের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়, তারপর শুরু হয় রান্না। গরম আবহাওয়ায় এক রকম, ঠান্ডায় দেওয়া হয় আরেক রকম মসলা। আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে মানুষের শরীর কোন মসলা কী পরিমাণ গ্রহণ করতে পারে। এত হিসাবনিকাশ করে রান্না হয় বলেই মামা হালিম দেশসেরা।

ঢাকাবাসীর ইফতারে এ হালিম থাকবে না, তা হয়?
কলাবাগান মাঠের উল্টো পাশে মামা হালিমের একমাত্র বিক্রয়কেন্দ্র। দূর-দূরান্ত থেকে ভোজনরসিকেরা আসেন সেখানে। রোজার সময় দুপুরের পরই শুরু হয় ভিড়। দেদারসে বেচাকেনা হয়। পাকিস্তান আমলে দুই বা চার পয়সায় যে পরিমাণ হালিম বিক্রি হতো, এখন সেটা ৭০ টাকা। অন্য সময় দোকানে বসেই খাওয়া যায়।

এখন শুধুই পার্সেল। রোজার সময় দেড় শ থেকে দেড় হাজার টাকার নানা আকারের মাটির হাঁড়িতে বিক্রি হয় গরু, খাসি ও মুরগির মাংসের হালিম।

স্বাধীনতার আগে মোহাম্মদপুরের মাল্লু ও কাল্লু ওস্তাদের কাছ থেকে গোপন রন্ধনশৈলী শিখেছিলেন মামা দীন মোহাম্মদ। তখন এর নাম ছিল ডাল-গোশত। পরে তিনি নাম দেন হালিম। সঙ্গে বিশেষ কায়দায় তৈরি তেঁতুলের টক। টকের দুটি প্যাকেট সামনে এনে তিনি বললেন, ‘এই দুটি প্যাকেটের ভেতরেও কেরামতি আছে। একটা মেয়েদের জন্য, একটা ছেলেদের। খেলে পাঁচ মিনিটেই পেটব্যথা চলে যাবে।’ কী আছে টকে, বলতে তিরি নারাজ। নিজের ছেলে রুবেল ও রাসেলকেও কেরামতি শেখাননি। শুধু বললেন, ‘বিট লবণ, জৈন আর পুদিনা পাতা আছে।

এগুলো পেটব্যথা দূর করতে সাহায্য করে।’ আর হালিমে? ‘হালিমে আছে অনেক পদের ডাল, শতাধিক মসলা। সাতটি মসলার কথা তো বলাই যাবে না।’ মুখে রহস্যময় হাসি মেখে তিনি বলেন, ‘একই হালিম তিন বছরের বাচ্চার ঝাল লাগবে না, ৩০ বছরের লোকের ঝাল লাগবে।’

এই হালিম এত মজার কেন? মামা দীন মোহাম্মদ বলেন, ‘তীব্র শীত, হালকা শীত, স্বাভাবিক আবহাওয়া ও গরমের প্রভাব পড়ে মানুষের শরীরে। তখন মসলার অনুপাত কমবেশি রাখতে হয়। মরিচ ব্যবহারেও থাকতে হয় সতর্ক। আজ বাজার থেকে যে মরিচ এনেছি, সেটা এক রকম ঝাল। কাল হয়তো আরেক রকম থাকবে। মরিচ ভেঙে জিভে স্পর্শ করে দেখতে হয়
ঝালের তেজ। প্রতিদিন তাই একই পরিমাণ মরিচ দেওয়া হয় না। যেসব মসলা ব্যবহার করি, বেশির ভাগ মানুষ সেগুলোর নামও জানে না। যেনতেন তেলের বদলে দেওয়া হয় দেশের সেরা ঘি, স্বাদ হবে না কেন?’

‘এইটা সততার ব্যবসা’, হাঁড়ির স্তূপের দিকে আঙুল নির্দেশ করে বললেন দীন মোহাম্মদ। ‘প্রতিদিন একই পরিমাণ হালিম তৈরি করি না। কারণ, প্রতিদিন কেউ হালিম খায় না। রোজার দ্বিতীয় দিনে যেগুলো তৈরি করেছি, তৃতীয় দিনে সেগুলো বিক্রি করি না। গতকাল হালিম ঘন ছিল, আজও ঘন।’
২৭ রমজানে একটি বিশেষ হালিম তৈরি করেন দীন মোহাম্মদ। তাতে থাকে এক শ গরু ও এক শ খাসির মগজ। আরও থাকে আলুবোখারা। আলুবোখারা কোনোটা মিষ্টি, কোনোটা টক। সব মসলার কথা বলেন না তিনি। জানান, এ হালিমে থাকবে বাদাম, কালিজিরা, সাদা ও কালো গোলমরিচ, জায়ফল, জয়ত্রী, মহামারি বস।

তিনি বলেন, ‘বস যন্ত্রে গুঁড়া করা হয় না, তাহলে গরম হয়ে যায়। হামানদিস্তায় পিষতে হয়। কিছু মসলা ভাজতে হয়, কিছু ভাজা ছাড়াই দিতে হয়। ভাজলে কিছু মসলা আছে তিতা হয়ে যায়। আমি মামা ছাড়া এত কিছু করে হালিম বানাবে কে?’

Facebook Comments