ধর্ষিত কিশোরীর আত্নহত্যা- উত্তাপ নেত্রকোনায়

ঈদুল আজহার পরের দিন গত রোববার রাতে নেত্রকোনা সদর উপজেলার ঠাকুরাকোনা ইউনিয়নে পান্না (১৪) নামের এক কিশোরী গণধর্ষণের শিকার হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরের দিন ওই কিশোরীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। কিন্তু ঘটনার ছয়দিনেও পুলিশ কাউকে আটক করেনি, এমনকি ধর্ষণ মামলাও নেয়নি। এ ঘটনায় বিচার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে নেত্রকোনা।

আজ শনিবার জেলার বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। তাদের দাবি, ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

মৃত পান্না আক্তার ঠাকুরাকোনা ইউনিয়নের রিকশাচালক লালচানের মেয়ে। সে ঢাকার একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করত।

স্থানীয় কয়েকজন ও নিহতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে গত ৩১ আগস্ট নেত্রকোনা সদর উপজেলার ঠাকুরাকোনা ইউনিয়নের গ্রামের বাড়িতে যায় পান্না। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ভবনসংলগ্ন একটি ঘরে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকত সে। ঈদের পরদিন ঠাকুরাকোনার বখাটে তরুণ মামুন কৌশলে পান্নাকে ঘরের বাইরে ডেকে নিয়ে যায়। পরে স্থানীয় মাছের খামারের একটি ঘরে নিয়ে মামুনসহ তিন তরুণ পান্নাকে ধর্ষণ করে। রাতে অনেক খোঁজার পর পান্নাকে মাছের খামারে পড়ে থাকতে দেখেন তার মা আলপিনা। এ সময় ধর্ষকরা তাঁকে নানা ভয়ভীতি ও হুমকি দেখায় বিষয়টি কাউকে না জানানোর জন্য। ভয়ে তিনি বিষয়টি কাউকে জানাননি।

পরের দিন সোমবার পান্নাকে বাড়িতে রেখে তার মা কাজে বেরিয়ে পড়েন। ঘরে ফিরে পাশের একটি ঘরে পান্নার ঝুলন্ত লাশ দেখতে পান তার মা। খবর পেয়ে নেত্রকোনা মডেল থানার পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

পান্নার পরিবারের অভিযোগ, পান্নার লাশ উদ্ধারের পর থেকেই ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে একটি প্রভাবশালী মহল চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা ধর্ষকদের বাঁচাতে চাইছে।

কিশোরীর মা আলপিনা বলেন, ‘‌ওরা আমার মেয়ের ইজ্জত নষ্ট করছে। ওরা আমাকে বলেছে, কাউকে জানালে তোদের সবাইকে মেরে ফেলব। আমরা গরিব মানুষ। কাজ-কাম কইরা খাই। তাই ভয়ে ওই দিন কাউকে কিছু বলিনি। আমি এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

এ বিষয়ে ঠাকুরাকোনা ইউপির চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘শুনেছি মামুনসহ কয়েকজন তরুণ এক কিশোরীকে ধর্ষণ করেছে। লালচানরা খুব গরিব মানুষ। মেয়েটি লজ্জায় গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে। আমিও চাই প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসুক এবং ঘটনায় জড়িতদের কঠোর শাস্তি হোক।’

পান্নার বাবা লালচান অভিযোগ করে বলেন, গত বুধবার তিনি থানায় ধর্ষণের অভিযোগ দিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ অভিযোগ না নিয়ে বলেছে, আগের অপমৃত্যুর মামলাটিই চলবে।

মামলা না নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমীর তৈমুর ইলী বলেন, ‘গত বুধবার আমি নেত্রকোনায় ছিলাম না। আমার কাছে মামলা নিয়ে আসেননি তিনি (লালচান), এলে মামলা নেব। মামলা না নেওয়ার কোনো কারণ নেই।’

ওসি আরো বলেন, ‘ওই ঘটনায় যেহেতু আমাদের সামান্য সন্দেহ আছে, তাই ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছি। প্রতিবেদন হাতে পেলে সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তবে এর আগে ওসি আমীর তৈমুর ইলী বলেছিলেন, ‘মেয়েটি (পান্না) স্বাভাবিকভাবেই গলায় ফাঁস দিয়ে মারা গেছে। কোনো রেপটেপ হয়নি। প্রেমসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অভিমানে মেয়েটি মরেছে।’

এদিকে পান্না আক্তারকে ধর্ষণের বিচার দাবিতে গতকাল শুক্রবার ও আজ নেত্রকোনার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। আজ ঠাকুরাকোনা বাজারে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তব্য দেন ঠাকুরাকোনা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল মজিদ, ঠাকুরাকোনা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি আহমদ হোসেন, বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান চন্দন, ঠাকুরাকোনা রহিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জিয়াউর রহমান জিয়া, ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মো. রাকিব, ছাত্রলীগ নেতা শফিকুল ইসলাম শফিক। এ ছাড়া মানববন্ধনে অংশ নেন কিশোরীর বাবা লালচান ও মা আলপিনা। পরে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে বাজারের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

গতকাল বিকেলে ঠাকুরাকোনা এলাকায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পান্নার মা-বাবা ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলেছেন নেত্রকোনা সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সানোয়ার হোসেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আজ দুপুরে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার জয়দেব চৌধুরী জানান, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ বলা যাবে। মডেল থানার ওসিকে বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে দেখতে বলা হয়েছে।

Facebook Comments