বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দরে ২০ দিন অপেক্ষার পর পণ্য খালাস

ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে বাংলাদেশমুখী ট্রাক পেট্রাপোল বন্দরে আসার পর পণ্য খালাসের জন্য ১৭ থেকে ২০ দিন অপেক্ষা করতে হয়। বন্দরে অবকাঠামো ঘাটতি, সরঞ্জামের অভাব, শ্রমিক না থাকা, সেবার নিম্নমানসহ বিভিন্ন কারণে এত বেশি সময় লাগে। ভারতের অংশের চেয়ে বাংলাদেশের অবস্থাই বেশি খারাপ। স্থলবন্দর ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার সিদ্ধান্তেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। অবশ্য ভারতে রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশি পণ্য সাত দিনেই ওপারে যেতে পারে।

‘বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি: বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর কী চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রস্তুত’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) গবেষকেরা। মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানে সানেমের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে গবেষণাটি প্রকাশ করা হয়।
গবেষণায় উঠে আসে, বেনাপোল ও পেট্রাপোলের পণ্য খালাসের ব্যবস্থাপনা নিয়ে বেশির ভাগ ব্যবসায়ী অসন্তুষ্ট। বাংলাদেশ ও ভারতের দুই পাশেই রাস্তা খুব সরু। যানজট লেগেই থাকে। বন্দরে প্রযুক্তির ব্যবহার করে নথির প্রয়োজনীয়তা কমানো এবং সময়ক্ষেপণ কমিয়ে আনতে প্রযুক্তির ব্যবহার নেই। এমনকি বন্দর এলাকায় খাবার, পানি ও শৌচাগারসেবাও নিম্নমানের।
ফলে দেখা যাচ্ছে, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের মতো দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোলেও পণ্যজট লেগেই থাকছে। আমদানির ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। বাংলাদেশের শিল্প খাতের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের বড় অংশ আসে ভারত থেকে। সম্প্রতি দেশটি থেকে চাল আমদানি বেড়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ৮০ শতাংশ হয় বেনাপোল-পেট্রাপোল দিয়ে।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, বন্দরের বর্তমান অবস্থা দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানো কঠিন। বন্দর উন্নত হলে অদূর ভবিষ্যতে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় দ্বিগুণ হবে। বিপরীতে ভারত থেকে আমদানি বাড়বে দেড় গুণ। তিনি বলেন, ভারত থেকে আমদানি বাড়লে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতি নয়। কারণ, দেশটি থেকে বাংলাদেশের শিল্পকারখানার কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আসে। আবার ভারত বাংলাদেশি পণ্যের বড় বাজার হতে পারে। এসব সম্ভাবনা ধরতে হলে স্থলবন্দরে বড় বিনিয়োগ দরকার।

দুই দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রায় ১০০ জন ব্যক্তির ওপর সানেম এই জরিপটি গত জুলাইয়ে পরিচালনা করে। আগস্টে বেনাপোল বন্দর ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি না, তা আবার যাচাই করা হয় বলে জানায় সানেম। সংস্থাটি বলেছে, প্রতিদিন গড়ে ৩৫০টি ট্রাক ভারত থেকে পণ্য নিয়ে বাংলাদেশে আসে। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে যায় ৮০টির মতো ট্রাক।

গবেষণার বিস্তারিত তুলে ধরে সেলিম রায়হান বলেন, বাংলাদেশ রপ্তানি ক্ষেত্রে পণ্য পরীক্ষায় দীর্ঘ সময় লাগার সমস্যায় ভোগে, ভারতও একই সমস্যায় ভুগছে। বাংলাদেশ অংশে পণ্য খালাসে শ্রমিকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় তিন ভাগের এক ভাগ আছে। ভারতের অংশে বনগাঁ থেকে ট্রাকের ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। এতে কোন ট্রাক আগে যাবে, তা ঠিক করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা চাঁদাবাজি করেন।

বাংলাদেশ অংশ নিয়ে সেলিম রায়হান বলেন, বেলা দুইটার পর শ্রমিকেরা বিশেষ কোনো কাজই করতে চান না। ফলে পণ্য খালাস হয় না।
সানেমের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বেনাপোল বন্দরের পণ্য মজুত করার ক্ষমতা ৪০ হাজার মেট্রিক টন, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। স্থান সংকুলান না হওয়ার জন্য ট্রাকগুলো প্রায়ই খোলা জায়গায় অবস্থান করে, পণ্যগুলোও উন্মুক্ত স্থানে আচ্ছাদন ছাড়া রাখতে হয়। বন্দরে এখন প্রায় ৪৩টি পণ্য রক্ষণাবেক্ষণ ছাউনি আছে, যা অনেক পুরোনো, জরাজীর্ণ এবং ময়লা-আবর্জনায় আচ্ছাদিত।

সংবাদ সম্মেলনে সানেমের গবেষণা সহযোগী মো. নাজমুল অভি হোসেন, মো. জাহিদ ইবনে জালাল ও মো. সাদাত আনোয়ার উপস্থিত ছিলেন।

Facebook Comments