মোটা গরু নয়, কিনুন সুস্থ গরু

কোরবানির ঈদ আসলেই গরু মোটাতাজাকরণের হিরিক পরে যায়। কিন্তু গরু মোটাতাজাকরণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গরুর সুস্থতা নির্ণয় করা। বর্তমানে স্টেরয়েড, হরমোন, উচ্চমাত্রার ভিটামিন অথবা রাসয়নিক দিয়ে মোটাতাজা করা গরুতে ভরে গেছে রাজধানীসহ সারা দেশের হাটগুলো।

কিন্তু সমস্যা হলো, সব স্বাস্থ্যবান গরু সুস্থ গরু না। একদল অসাধু ব্যবসায়ী দ্রুত গরু মোটাতাজা করতে গিয়ে খাবারের সাথে স্টেরয়েড ট্যাবলেট (পাম বড়ি) ও বিভিন্ন গ্রোথ হরমোন মিশিয়ে দেয়। যা অত্যন্ত ক্ষতিকর। ফলে গরু কৃত্রিমভাবে ফুলে-ফেঁপে ওঠে।

এ ধরণের ট্যাবলেট গরুর লিভার ও কিডনি নষ্ট করে। এছাড়া স্বাভাবিক বিপাক ক্রিয়াও বাঁধাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। তাই এ ধরণের গরুর মাংস খাওয়া মানুষের শরীরের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের অধ্যাপক ড. আবু হাদি নূর আলী খান বলেন, ‘অতিমাত্রায় স্টেরয়েড ট্যাবলেট ব্যবহার করলে গরুর শরীরে ব্যাপক পানি জমে। এতে গরু মোটাতাজা দেখায়। কিন্তু এর ফলে  গরুর কিডনি, লিভার ও পাকস্থলি নষ্ট হয়ে যায়। এই গরুর মাংস খেলে মানবদেহে নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।’

তাই তিনি বলেন, কোরবানির জন্য অবশ্যই প্রয়োজন  সুস্থ ও ভালো গরু কেনা।

ভালো গরু, মন্দ গরু চেনার উপায়

১) স্টেরয়েড ট্যাবলেট খাওয়ানো গরুর মুখে বেশি পরিমাণে লালা বা ফেনা থাকবে। তাই এ ধরণের গরু কেনা থেকে বিরত থাকুন।

২) ভালো করে লক্ষ করুণ, আপনার পছন্দের গরু চটপটে কি না? ভালো গরু দৌড়াতে চাইবে, কান দিয়ে মশা, মাছি তাড়াবে, সাথে সাথেই লেজ নাড়াবে। কিন্তু স্টেরয়েড খাওয়ালে গরু নড়াচড়ার বদলে ঝিম মেরে থাকবে।

৩) স্টেরয়েড ট্যাবলেট খাওয়ানো গরুর ঊরুতে প্রচুর মাংস থাকে। তাই এ ধরণের গরু কিনবেন না।

৪) গরু কেনার সময় চামড়ার নিচে চর্বিতে কোনো ক্ষত আছে কি না! দেখে কিনুন।

৫) গরুর নাকের মাজল শুকনো থাকা রোগের লক্ষণ । এছাড়া রোগে আক্রান্ত হলে গায়ের তাপমাত্রাও বেশি থাকে। এ দুটি বিষয় লক্ষ্য রাখুন।

৬) গরুর গায়ে আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিন। তার মাংস দেবে গিয়ে যদি দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, তাহলে বুঝতে হবে গরুটি সুস্থ। আর সময় নিলে বুঝতে হবে অসুস্থ।

৭) তবে অনেক ক্ষেত্রে কোরবানির হাটে ভিড় দেখে গরু ভয় পেয়ে যায়। এতে সুস্থ গরুরও পাতলা পায়খানা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

৮) অনেক সময় সুস্থ গরু হাটে নিয়ে আসার পর অসুস্থ হয়ে পরে। কারণ হাটে খোলা বাতাসে গরুর দুই পায়ের মাঝে ঘা হবে, আর মুখ দিয়ে লালা পরতে থাকবে। তাই আপনার কোরবানির গরুটি দেখে কিনুন।

৯) গরুর মুখের সামনে খাবার ধরলে যদি নিজ থেকে জিহ্বা দিয়ে খাবার টেনে নিয়ে খেতে থাকে তবে বোঝা যাবে গরুটি সুস্থ। যদি অসুস্থ হয়, তবে সে খাবার খেতে চায় না।

১০) গরুর হাটে ভেটেরিনারির চিকিৎসক থাকে, আপনি চাইলে আপনার  কোরবানির পশুটি পরীক্ষা করে নিতে পারেন।

অসুস্থ গরু কিনবেন না

গরু মোটাতাজাকরণের স্বাভাবিক পদ্ধতিও আছে। কিন্তু মাত্র দুই তিন সপ্তাহের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে স্বাস্থ্য বৃদ্ধি কেবল গরুর জন্যই ক্ষতিকর নয় ,মানুষের জন্যও বিপদের কারণ। অতিরিক্ত স্টেরয়েড ট্যাবলেট গরুর মাংসে সঞ্চয় হয়ে থাকে। কোরবানির ২০ থেকে ২৫ দিন আগে অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রতিটি গরুকে এক সাথে ২০ থেকে ৩০টি পর্যন্ত ট্যাবলেট খাওয়ান। ইনজেকশনও দেওয়া শুরু করেন। এতে গরু অতি দ্রুত মোটা হয়ে ওঠে।

রান্নার সময় অনেক তাপেও এই বিষ নষ্ট হয় না। ফলে এই মাংস খাওয়ার সময় তা মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। যা মানুষের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া কিডনি ও লিভারেরও ক্ষতি করতে পারে।

তাছাড়া অসুস্থ গরু কোরবানি দেওয়া ঠিক নয়।  এই বিষয়ে কৃষি বিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন, প্রত্যেক হাটে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভেটেরিনারি চিকিৎসক থাকে না। ফলে সুস্থ গরু চিনে কিনার সুযোগ কম থাকে। তাই হাটে ভেটেরিনারি চিকিৎসক থাকতে হবে।

Facebook Comments