যাত্রীদের ভোগান্তি দেখতে চান না সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রী

বন্যার পাশাপাশি অতিবর্ষণের জের ধরে ঈদ যাত্রা সামনে রেখে জেগে ওঠা ভয় দূর করতে চান সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

মহাসড়ক নির্বিঘ্ন রাখতে তিনি ছুটে চলেছেন দিন-রাত। গতকাল শুক্রবার সকালে ঢাকা থেকে বিভিন্ন মহাসড়ক নিজের চোখে দেখতে দেখতে দুপুরে কালিয়াকৈরে পৌঁছে দেশের ৯টি সড়ক বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৌশলীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক নিয়ে যানজটের সবচেয়ে বেশি ভয় জাগছে বা জাগানো হচ্ছে। তবে গতকাল সড়কমন্ত্রীর পরিদর্শনকালে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ছাড়াও চন্দ্রা-নবীনগর, আশুলিয়া-বাইপাইল মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে মেরামতকাজ চলতে দেখা গেছে। সড়কমন্ত্রীর চলাচলের সময় মহাসড়কে যানজট ছিল না। সওজের প্রকৌশলীরা ঈদের দিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ছুটি পাবেন। বাকি সময় তাঁদের ‘রাস্তায় থাকার’ নির্দেশ দিয়েছেন সড়কমন্ত্রী। গতকাল থেকে মহাসড়কে উন্নয়নকাজ বন্ধ রাখা শুরু হয়েছে। এ কাজ সাত দিন বন্ধ থাকবে। তবে মেরামতকাজ চলবে।

দুপুরে কালিয়াকৈরে (জয়দেবপুর-এলেঙ্গা চার লেন প্রকল্পের বেস ক্যাম্পে) সড়কমন্ত্রী ৯টি সড়ক বিভাগের প্রকৌশলীদের কাছে বিভিন্ন মহাসড়কের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চান। বৈঠক থেকেই বন্যায় বিধ্বস্ত দিনাজপুর সড়ক বিভাগের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর কাছে মোবাইল ফোনে পরিস্থিতি জেনে নেন। বৈঠকে সড়কমন্ত্রী প্রকৌশলীদের বলেছেন, ‘আমি রাত ৮টা, ২টায় যেন কারো ফোন না পাই। এ ধরনের ফোন আমাকে বড় কষ্ট দেয়। যানজটে পড়ে থাকা লোকজনের কান্না শুনতে চাই না। গত রোজার ঈদে দুর্ভোগ ছিল না। এবারও যেন তা-ই হয়। ’

সওজ অধিদপ্তরের মহাসড়ক উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের (এইচডিএম) সর্বশেষ জরিপ অনুসারে, ৩৭ শতাংশ খারাপ থেকে খুব খারাপের পর্যায়ে ছিল। তবে ভালো বা চলনসই ছিল বাকি ৬৩ শতাংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যা ও সেই সঙ্গে অতিবর্ষণে ভালো সড়কের কোথাও ভেসে গেছে, কোথাও ভেঙে পড়েছে, কোথাও বর্ষণের পানি জমে থাকায় মেরামত করেও ফল মিলছে না। দেশের উত্তরের দিনাজপুর, কুড়িগ্রামসহ কমপক্ষে ১৫টি জেলার প্রায় ৬০০ কিলোমিটার মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন অংশও রয়েছে। এ মহাসড়ক চার লেন করা হচ্ছে জয়দেবপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত। দুই লেন মহাসড়কের ওপর দিয়েই ঢাকা থেকে উত্তরের ১৬ জেলার যাত্রীদের চলাচল করতে হয়। ঈদে এ মহাসড়কে গাড়ির সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে।

এ মহাসড়কের দেখভালের দায়িত্ব গাজীপুর ও টাঙ্গাইল সড়ক বিভাগের। পাশের সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া সড়ক বিভাগের অধীন সড়ক-মহাসড়কের অংশও বিধ্বস্ত হয়েছে। ফলে এসব সড়ক বিভাগের প্রকৌশলীদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব সড়ক বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৌশলীদের কাছ থেকে জানা গেছে, নলকা সেতুসহ বিভিন্ন সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল সিরাজগঞ্জে। সেখানে জরুরি মেরামতকাজ শেষ পর্যায়ে। সিরাজগঞ্জ সড়ক বিভাগের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী জানান, বরাদ্দ নেই, ঠিকাদার প্রায় ২০০ জন। একজনকে কাজ দিলে অন্যজন কাজ চায়। এ অবস্থায় ওপরের চাপে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করতে হচ্ছে।

বৈঠকে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী সিরাজগঞ্জ সড়ক বিভাগের অবস্থা জানতে চাইলে ওই সড়ক বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নলকা সেতুর কাজ শেষ হচ্ছে, ওভারলে চলছে।

সড়কমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে, বগুড়া সড়ক বিভাগের ৬৫ কিলোমিটার এখন চলাচলের উপযোগী। সেখানে সব গর্ত ভরাট করা হয়েছে। জয়দেবপুর থেকে এলেঙ্গা চার লেন প্রকল্পের পরিচালক দিলীপ কুমার গুহ বৈঠকে অংশ নিতে আগেভাগে প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলেন। কিছুটা উদ্বিগ্ন দিলীপ বৈঠকে অবশ্য মন্ত্রীর কাছে বলেন, ভোগড়া থেকে চন্দ্রা অংশ যান চলাচলের উপযোগী।

বৈঠকে তারপর মন্ত্রী বন্যায় দিনাজপুরে সড়কের বেশি ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করে বলেন, ‘দিনাজপুর আমি গিয়েছিলাম, সেখানে এক জায়গায়ও রাস্তার চিহ্ন রাখেনি বন্যা। ’ তিনি ওই সময় সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর কাছে মোবাইল ফোনে সৈয়দপুর-দিনাজপুর, রংপুর-সৈয়দপুর সড়কের অবস্থা জেনে নেন। খোঁজ নেন বগুড়া-রংপুরসহ বিভিন্ন মহাসড়কের।

ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গাইবান্ধা, যশোর, মাগুরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, খুলনা, বরিশাল, নরসিংদী, সিলেট ও নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন সড়ক। জানা গেছে, বন্যায় দেশের ১৭টি আঞ্চলিক ও জেলা সড়ক পানিতে নিমজ্জিত ছিল। ৭৩টি জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে তিন কিলোমিটার পানিতে ভেসে গেছে। দিনাজপুর ও কুড়িগ্রাম জেলায় সড়ক সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।

সকালে গাজীপুরের চন্দ্রায় সড়ক পরিস্থিতি দেখেন সড়কমন্ত্রী। তখন ঘড়িতে সকাল ১১টা। তিনি গাড়ি থেকে নেমে সাংবাদিকদের বলেন, ‘বৃষ্টিকে ভিলেন বানিয়ে, অজুহাত সৃষ্টি করে রাস্তা যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী থাকবে—এটা হয় না। বৃষ্টিরও ট্রিটমেন্ট আছে। যখন বৃষ্টি চলে, তখনো রাস্তার ট্রিটমেন্ট থাকতে হবে। পশুবাহী গাড়িগুলো যখন তখন যদি আটকে যায়, বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে যান চলাচলে সমস্যা হবে। বন্যায় উত্তরাঞ্চলে বিভিন্ন সড়কের ৫০টি পয়েন্টে এক থেকে তিন কিলোমিটার রাস্তা এখনো পানির নিচে আছে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রকৌশলীরা সেখানে গিয়ে রাস্তা মেরামতের কাজ সম্পন্ন করছেন। ’

সকাল সাড়ে ৯টায় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ থেকে গাড়িযোগে রওনা দেন সড়কমন্ত্রী। ছুটির দিনেও যানজটের মুখে থামতে থামতে চলতে হয়েছে। আশুলিয়া, জিরানিসহ বিভিন্ন স্থানে ধীরলয়ে গাড়ি চলছিল। তবে চন্দ্রা মোড়ে গিয়ে যানজটের দৃশ্য চোখে পড়েনি। সড়কমন্ত্রী জানান, সড়ক আগের চেয়ে প্রশস্ত করা হয়েছে।

বৈঠকে অংশ নেন ঢাকা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীরা। এ ছাড়া ছিলেন ঢাকা, ময়মনসিংহ, জামালপুর সড়ক বিভাগের প্রতিনিধিরা।

ট্রেন বন্ধ, উত্তরের যাত্রীদের চাপ পড়বে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে : ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড় হয়ে প্রতিদিন উত্তরবঙ্গের ১১৭টি সড়কের হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। এবার বন্যায় রেলপথ বিধ্বস্ত হওয়ায় উত্তরের দিনাজপুর, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় যেতে যাত্রীদের কাছে টিকিট বিক্রি করতে পারেনি রেলওয়ে। যাত্রীদের বড় একটি অংশ উত্তরের বিভিন্ন জেলায় যেতে বাসের টিকিট কিনেছে। এবার তাই ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে বেশি চাপ পড়বে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুরের কালিয়াকৈরের বোর্ডঘর থেকে মৌচাকের তেলিরচালা পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার সড়কের বিভিন্ন অংশে বিটুমিন উঠে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে গর্তের। এসব গর্ত সংস্কার করা হচ্ছে। গতকাল বিকেলে থেমে থেমে যানজট সৃষ্টি হয়। গত বৃহস্পতিবার ও তার আগের দিনও গাড়ির গতি ছিল ধীর। বৃষ্টিপাতের দরুন যানজট তীব্র হয়ে উঠছে।

সড়কের চন্দ্রা ত্রিমোড় থেকে মৌচাকের তেলিরচালা অংশে কোথাও খানাখন্দ, কোথাও ছোট-বড় গর্ত আবার কোথাও পিচঢালাই উঠে গেছে বর্ষণে। মেরামত করা হলেও বৃষ্টি হলে পানি জমছে। স্থানীয়রা জানায়, কোনাবাড়ী, সফিপুর ও চন্দ্রা মোড়ে গাড়ির গতি ধীর হয় বৃষ্টি হলেই।

সওজ অধিদপ্তরের ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সবুজ উদ্দিন খান জানান, গতকাল বৈঠকে অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের ২০ জনের বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। বিশেষ করে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক নিয়ে কারো কারো মনে যে ভয় তৈরি হয়েছে তা দূর করতে এবং নির্দেশনার জন্য গতকাল বৈঠকটি হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জামালপুর ও শেরপুর সড়ক বিভাগের অবস্থাও সড়কমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে।

Facebook Comments