রাজধানীতে বাড়ছে কুকুরের কামড়ের আতঙ্ক

রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় কুকুরের কামড়ে বা আঁচড়ে গত ৯ মাসে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫১ হাজার ৩২১ জন। গত পাঁচ বছরে কুকুরে আক্রান্ত ৩ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৭ জন এই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন।

জলাতঙ্কে আক্রান্ত কুকুরের কামড় খেয়ে টিকা না নিলে মানুষেরও জলাতঙ্ক রোগ হয়। গত ৯ মাসে রাজধানী ও এর আশপাশে জলাতঙ্ক রোগে ১৩ জন মারা গেছেন। সারা দেশে গত পাঁচ বছরে এ রোগে মারা গেছেন ৪৪২ জন। এই তথ্য কেবল মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের। এর বাইরে সব জেলা হাসপাতালে বিনা মূল্যে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হয়। সে হিসাব ধরলে কুকুরে আক্রান্ত ও জলাতঙ্কের রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হবে।

রাজধানীতে একমাত্র মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বিনা মূল্যে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হয়। বেসরকারি কিছু হাসপাতালেও জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হয়। তবে তারা এর হিসাব সংরক্ষণ করে না।

কুকুরের সংখ্যা বেড়ে গেলে সাধারণত সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো তা নিধন করত। কিন্তু অমানবিক হওয়ায় উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০১২ সাল থেকে সারা দেশে কুকুর নিধন বন্ধ আছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কুকুর নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সারা দেশে কুকুরের সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে। বেড়েছে কুকুরের কামড়ে আক্রান্তের সংখ্যাও। প্রতিটি কুকুর বছরে গড়ে ১২টি করে বাচ্চা দেয়। এর ১০ শতাংশ মারা যায়।

 

এ অবস্থায় ঢাকায় বেসবকারি প্রতিষ্ঠান ‘অভয়ারণ্য’ কুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণে কার্যক্রম শুরু করে। হিউমেন সোসাইটি ইন্টারন্যাশনাল ও ওয়ার্ল্ড ফুড অর্গানাইজেশনের অর্থায়নে সংস্থাটি ২০১৪ সাল পর্যন্ত ঢাকার দুই সিটিতে প্রায় ১০ হাজার কুকুর বন্ধ্যাকরণ করে ও টিকা দেয়। ২০১৫ সালে এই কর্মসূচি বন্ধ থাকে। ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে অভয়ারণ্য আবার কার্যক্রম শুরু করে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় তাদের এই কর্মসূচি চলছে। ওই সময় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এ কাজে আগ্রহ দেখায়নি। চলতি মাস থেকে তারা নিজেরা টিকা দেওয়া ও শুধু পুরুষ কুকুর বন্ধ্যাকরণের কাজ হাতে নিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কুকুরের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে মানুষের ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়বে। তাই কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।

২০১৬ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিউমেন সোসাইটি ইন্টারন্যাশনাল ঢাকা শহরের কুকুর জরিপ করে। তাদের হিসাবে দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩৭ হাজার ৯টি মালিকহীন বা পথকুকুর আছে। এর মধ্যে ডিএনসিসি এলাকায় ২৪ হাজার ৩৮৪ ও ডিএসসিসি এলাকায় আছে ১২ হাজার ৬২৫টি কুকুর। এখন এই সংখ্যা আরও বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আতঙ্ক বাড়ছে

মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান সৈয়দ আহসান তৌহিদ বলেন, রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকা থেকে এখানে রোগীরা আসেন। রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। নতুন-পুরোনো মিলে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ রোগীকে টিকা দিতে হচ্ছে।

কুকুর নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়ে সৈয়দ আহসান তৌহিদ বলেন, শুধু টিকা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। কুকুর নিয়ন্ত্রণে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

ডিএনসিসির কার্যক্রম

অভয়ারণ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান রুবাইয়া আহমেদ বলেন, ডিএনসিসির সঙ্গে অভয়ারণ্য ও হিউমেন সোসাইটি ইন্টারন্যাশনালের ত্রিপক্ষীয় একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সে অনুযায়ী ডিএনসিসির পাঁচটি অঞ্চলের একটিতে (অঞ্চল-৩) হিউমেন সোসাইটি ইন্টারন্যাশনালের অর্থায়নে চলতি অক্টোবর পর্যন্ত টিকাদান ও বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচি পালন করবে অভয়ারণ্য। বাকি চার অঞ্চলে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন করবে ডিএনসিসি।

অভয়ারণ্যের চলমান প্রকল্পটির ব্যবস্থাপক সারা জাররার বলেন, ডিএনসিসির অঞ্চল-৩-এ ৪ হাজার ১০০ কুকুরকে টিকা দেওয়া ও বন্ধ্যাকরণ করা হয়েছে।

ডিএনসিসির অন্য এলাকায় একই কর্মসূচি বাস্তবায়নে অভয়ারণ্য ২ কোটি ৬০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প জমা দিয়েছে অভয়ারণ্য।

অভয়ারণ্য ডিএসসিসিকেও একই রকম প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু তারা আগ্রহ দেখায়নি। এখন ডিএসসিসি নিজেরাই (২ অক্টোবর থেকে) টিকা ও বন্ধ্যাকরণ শুরু করেছে। ডিএসসিসির অঞ্চল-৫-এর জন্য তাদের বরাদ্দ প্রায় ১ কোটি টাকা। এরপর পুরো ডিএসসিসিতে এ কার্যক্রম চালানো হবে।

জলাতঙ্ক

সাধারণ কুকুরের কামড়ে সংক্রমণ, টিটেনাস রোগের আশঙ্কা থাকে। শিশুদের নাক-মুখে কুকুর কামড়ালে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ ক্ষেত্রেই তারা মারা যায়। র‍্যাবিস ভাইরাসে আক্রান্ত কুকুর, বিড়াল, শিয়াল, বেজি, বানর বা চিকার মাধ্যমে জলাতঙ্ক রোগ ছড়ায়। আমাদের দেশে মূলত কুকুরের কামড়ে বা আঁচড়ে (রক্ত বের না হলেও) জলাতঙ্ক রোগ বেশি হয়।

সময়

শরীরের কোন অংশে কামড় বা আঁচড় দিয়েছে, তার মাত্রার ওপর নির্ভর করে কত দিনে জলাতঙ্ক দেখা দেবে। সাধারণত এক সপ্তাহ থেকে তিন মাসের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়। শরীরের নিচের অংশে কামড় বা আঁচড় দিলে এবং এর মাত্রা কম হলে সাত বছর সময়ের মধ্যে যেকোনো সময় জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে গেলে মানুষ সাধারণত বাঁচে না।

লক্ষণ

আক্রান্ত ব্যক্তি অস্বাভাবিক আচরণ করে। ক্ষত স্থানে ব্যথা হয়, জ্বালাপোড়া করে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ঢোক গিলতে গলায় ব্যথা লাগে। জ্বরও হতে পারে। খিঁচুনিও হতে পারে। মুখ দিয়ে লালা ঝরে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। ইচ্ছা থাকলেও পানি খেতে পারে না। বাতাস সহ্য করতে পারে না। মৃত্যুর আগে আলো দেখলে ভয় পায়। আবার পা থেকে শুরু করে পুরো শরীর অবশ হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ রোগী পক্ষাঘাতগ্রস্ত হতে পারে। একসময় রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। পরিণতি মৃত্যু।

আক্রান্ত কুকুর চেনার উপায়

র‍্যাবিস ভাইরাসে আক্রান্ত কুকুর পাগলের মতো আচরণ করে। যেখানে যা পায়, কামড়ানোর চেষ্টা করে। উদ্দেশ্যহীনভাবে ছুটে বেড়ায়। মুখ থেকে লালা পড়তো থাকে। সারাক্ষণ ঘেউ ঘেউ করে। একপর্যায়ে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে। খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং মারা যায়।

পরামর্শ ও প্রতিরোধ

কুকুরের কামড় বা আঁচড়ের পর ক্ষত স্থানটি ক্ষারযুক্ত সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ধরে ধুতে হবে ও টিকা নিতে হবে। মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায়। কুকুর নিয়ন্ত্রণে সরকারি পদক্ষেপের পাশাপাশি ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বাড়িতে পোষা কুকুরকে নিয়মিত টিকা দিতে হবে। বেওয়ারিশ বা পথকুকুর থেকে সাবধান থাকতে হবে।

ডিএনসিসির টিকা দেওয়া কুকুর

ডিএনসিসি এলাকায় টিকা দেওয়া কুকুরের একটি কান ত্রিভুজ আকারে কাটা। টিকা দেওয়ার এক বছরের মধ্যে কামড়ালে জলাতঙ্ক হয় না। প্রতিদিন ২০টি কুকুরকে টিকা দেওয়া ও বন্ধ্যাকরণ করা হচ্ছে। ডিএনসিসির অঞ্চল-৩-এ ৪ হাজার ১০০ কুকুরকে টিকা দেওয়া ও বন্ধ্যাকরণ করা হয়েছে

ডিএসসিসির টিকা দেওয়া কুকুর

ডিএসসিসি এলাকায় টিকা দেওয়া নারী কুকুরের গায়ে রং মেখে দেওয়া হয়েছে। পুরুষ কুকুরের গলায় বেল্ট বাঁধা। টিকা ছাড়া শুধু পুরুষ কুকুর বন্ধ্যাকরণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নারী কুকুরও বন্ধ্যাকরণ করতে হবে। কারণ এলাকায় সব পুরুষ কুকুর বন্ধ্যাকরণ করা সম্ভব নয়। আবার অন্য এলাকা থেকেও আসতে পারে পুরুষ কুকুর। ফলে প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

 

Facebook Comments