রাত লুটালো মেসির পায়ে

ধারাভাষ্যকার গোওওওলল বলে চিৎকার করছেন। কিছুতেই থামছেন না। গ্যালারি থেকে ভেসে আসছে সাইক্লোন। কেউ কাঁদছেন কেউ হাসছেন। চোখের জল আর হাসি যেন মিলেমিশে একাকার। ‘ঈশ্বর প্রদত্ত’ ওই বাঁ পা থেকে তিনটি গোল। শেষ পর্যন্ত ৩-১ ব্যবধানের জয় নিয়ে আর্জেন্টিনার সরাসরি বিশ্বকাপে চলে যাওয়া। ১০ আর ১১ অক্টোবরের রাত-সকাল মিলিয়ে ইকুয়েডরের মাঠে লেখা হল এমনই মহাকাব্য।

অন্য ম্যাচে ব্রাজিলের বিপক্ষে চিলি ৩-০ গোলে হারায় বাদ। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পেরুকে খেলতে হবে প্লেঅফে। ব্রাজিল এই অঞ্চল থেকে সেরা। তিন নম্বরে থেকে বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে মেসির দল।

সাম্পাওলি এদিন ৩-৪-২-১ পজিশনে দল সাজান। জাভিয়ের মাসচেরানো সেই ডিফেন্সিভ মিডেই দাঁড়িয়ে যান। বার্সার এই নামকরা মিডফিল্ডার আর্জেন্টিনার হয়ে গত কয়েক বছর ধরে অ্যাটাকিং বাদ দিয়ে ডিফেন্সিভ মিডে খেলছেন। তাকে সঙ্গে দেন ওটামেন্ডি এবং মের্কাদো। মাঝমাঠে সালভিও, পেরেজ, বিগলিয়া এবং অ্যাকুনা। তাদের সামনে মেসি এবং ডি মারিয়া। আর স্ট্রাইকে বোকা জুনিয়র্সের বেনোদেত্তো।

ম্যাচের একদম শুরুতে, প্রথম মিনিটে কোটি হৃদয়ের কল্লোল থেমে যাওয়ার উপক্রম হয় ইকুয়েডরের রবের্তোর এক হেডে। বক্সের ঠিক মাঝখানে সেই হেড চলে যায় রোমারিও ইবারার কাছে। বাঁ পায়ের শটে ডান কোনা দিয়ে বল জালে পাঠান।

মেসির বাঁ পায়ে এই রাত লুটাবে বলেই এভাবে পিছিয়ে পড়া। আর ১২তম মিনিটে ফিরে আসা। বক্সের ঠিক সামনে থেকে বল ধরে ডি মারিয়াকে ছাড়েন ফুটবল জাদুকর। মারিয়া তিন পা এগিয়ে কাটব্যাক করে ফের মেসিকে বল দেন। দুই পাশে দুই ডিফেন্ডার। সামনে গোলরক্ষক। বল ডান পায়ের পজিশনে। মেসি ব্যবহার করলেন তার ঈশ্বরপ্রদত্ত ওই বাম পা। টোকা দিয়ে খুঁজে নিলেন জাল।

 

দ্বিতীয় গোলটিও মেসি-মারিয়া বোঝাপড়ার এক অপূর্ব দৃশ্য। ২০তম মিনিটে বক্সের অনেকটা বাইরে থেকে মেসিকে বল দেন মারিয়া। ভিড়ের ভেতর থেকে পাশ কাটিয়ে মেসি আগে উঠে যান। সামনে গোলরক্ষক। পাশে তিনজন। এবারও সেই বাঁ পা। প্রথম পোস্ট দিয়ে জোরালো শট। একটু তুলে মারেন। গোলরক্ষক মাটিকামড়ানো পাস ভেবে ডাইভ দিতে চেয়েছিলেন। বল জালে জড়ায় তার মাথার উপর দিয়ে।

৩৩ মিনিটে ডিবক্সের ঠিক সামনে থেকে ডি মারিয়ার জন্য সুস্বাদু একটি পাস সাজিয়ে দেন মেসি। গোলরক্ষকের সামনে থেকে চিপ করতে যেয়ে ব্যর্থ হন মারিয়া।

প্রথমার্ধের হিসাব-নিকাশ:

এই সময়ে দুদলই প্রায় সমানে সমান লড়াই করেছে। সমতায় ফেরার পর আর্জেন্টিনা বেশি বেশি পাসিং ফুটবল খেলতে থাকে। এ সময় ২১৩টি পাস দেন মেসিরা। ইকুয়েডর ২০৩টি। গোলমুখে দুদলের শট ছিল তিনটি করে।

দ্বিতীয়ার্ধ:

দুই দলই রক্ষণে নজর দিয়ে শুরু করে। ৫৮ মিনিটে মেকার্দো গোলের কাছে গিয়েও ফিরে আসেন।

৬২তম মিনিটে আবার আর্বিভূত হন মেসি। মাঝ মাঠের একটু উপর থেকে পেরেজ বল দেন। এবার একটু দূর থেকে শট নেন। অবদান সেই বাঁ পায়ের। সঙ্গে লেগে ছিলেন তিনজন। আগুয়ান মেসি বল কাট করে হালকা বাঁদিকে সরে যান। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার হাত দিয়ে ফেলে দেয়ার আগেই বল তুলে মারেন। গোলমুখ ছোট করতে রক্ষক একটু সামনে ছিলেন। তাতে কাজ হয়নি। মেসির তুলে দেয়া বল তার মাথার উপর দিয়ে জালে জড়ায়। ইকুয়েডর গোলরক্ষক সামনে পজিশন নেয়ায় বল টাচও করতে পারেননি!

 

৬৮তম মিনিটে বিপজ্জনক এলাকা থেকে বেনোদেত্তোকে দারুণ একটি স্কয়ার-পাস দেন মেসি। ইকুয়েডর কর্নারের বিনিময়ে সেবার রক্ষা পায়।

দুই মিনিট বাদে আবার মেসির কাছ থেকে বল পেয়ে নষ্ট করেন ওই বেনোদেত্তো। গোটা ম্যাচেই যিনি নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন।

৭১তম মিনিটে ইকুয়েডরের পেদ্রো ভেলাসকো ৩৫ গজ দূর থেকে ডান পায়ে শট নেন। বারের বেশ উপর দিয়ে বল বাইরে যায়।

৭৯তম মিনিটে ইকুয়েডরের একটি সুযোগ নষ্ট হয়। রামিজের ক্রস থেকে এস্ত্রাদা বক্সের ভেতর থেকে হেড নেন। কিন্তু লক্ষ্য ঠিক থাকেনি। ৯০ মিনিটের পরও ইবারা এবং ওই এস্ত্রাদা দুদুটি সুযোগ মাটি করেন।

‘সুযোগ’ তাদের কারণে মাটি হয়নি। এ যে নিয়তির খেলা। কোনো একজন কোথাও বসে নিশ্চয়ই আপন মনে লিখে রেখেছিলেন, এ রাত লুটাবে মেসির পায়!

Facebook Comments