শিশু পার্কে দুর্নীতি- খবর নেই প্রশাসনের

প্রায় দুই কোটি মানুষের শহর ঢাকায় একটি মাত্র সরকারি শিশু পার্ক হচ্ছে শাহবাগের শিশু পার্ক। কিন্তু পার্কটির ভেতরে-বাইরে চলছে চরম অব্যবস্থাপনা। রাইড মাত্র ১০টি। এর টুঁটি চেপে ধরেছেন সাত প্রভাবশালী ব্যক্তি। সরকারি দলের পরিচয়ে তাঁরা নিয়ন্ত্রণ করছেন পার্ক ও আশপাশের এলাকা। ভেতরে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, হকার বসানোসহ বাইরের অংশে শত শত অবৈধ দোকান বসিয়ে চাঁদা তুলছেন তাঁরা। ইজারা ছাড়াই সিটি করপোরেশনের প্যাড বানিয়ে পার্কিংয়ের নামে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করছেন। এসব চোখের সামনে ঘটলেও ডিএসসিসির কর্মকর্তারা কিছু করতে পারছেন না। প্রতিবাদ করতে গিয়ে সরকারি কর্মকর্তারা শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন।

গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় হাজার হাজার দর্শনার্থীর পদচারণে মুখরিত শাহবাগে অবস্থিত শহীদ জিয়া শিশু পার্ক। ফটকের বাইরে কোনো ব্যক্তিগত যানবাহন থামলেও লাঠি হাতে এগিয়ে আসেন সাইদুল নামের এক যুবক। সাইদুলের হাতে একটি রসিদ বইও রয়েছে। তিনি মোটরসাইকেল থেকে ৩০ টাকা আর কার ও মাইক্রোবাস থেকে ৪০ টাকা করে আদায় করছেন। বিনিময়ে ধরিয়ে দিচ্ছেন ‘ঢাকা সিটি করপোরেশন পার্কিং কমপ্লেক্স’ লেখা একটি রসিদ। সাইদুলের মাধ্যমে জানা যায়, পার্কিংয়ের ‘ইজারাদারের’ নাম ‘ফজর আলী’।

সাইদুল বলেন, ‘এখানে প্রতিদিন ছোট-বড় ৩০০ যানবাহন পার্কিংয়ের জন্য আসে। সেখান থেকে দৈনিক কমবেশি ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা আসে। ফজর আলী ভাই ইজারা দিয়েই ব্যবসা করছেন। ’ সাইদুলের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী প্রতি মাসে পার্কিংয়ের নামে টাকা ওঠে দুই লাখ ৭০ হাজার, যা বছর শেষে হয় প্রায় ৩২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ বিশাল অঙ্কের টাকার একটি টাকাও পাঁচ বছর ধরে সরকারি কোষাগারে জমা হয় না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) খান মোহাম্মদ বিলাল বলেন, ‘শিশু পার্কের সামনে আমরা কোনো ধরনের পার্কিং ইজারা দিইনি। দর্শনার্থীদের চলাফেরার সুবিধার্থে জায়গা খালি রাখা হয়েছে। এখন কে বা কারা সিটি করপোরেশনের নামে এই চাঁদা ওঠায় তা আমাদের জানা নেই। ’

অনুসন্ধানে জানা যায়, ফজর আলীর মতো এমন সাতজনের একটি সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে সরকার নিয়ন্ত্রিত এ বিনোদনকেন্দ্রটি। তাঁরা হলেন ২০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ‘শিশু পার্ক ইউনিট’ সভাপতি হেদায়েত সরদার রানা, আওয়ামী লীগ নেতা ফজর আলী খাঁ, শাহবাগ থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফা কামাল, বাচ্চু মোল্লা, মিজান, রাজু, রাসেল। এ ছাড়া পার্ক এলাকায় আরো একাধিক দোকান বসিয়েছেন বঙ্গবন্ধু সমাজকল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বাহালুল মজনু চুন্নু। এর মধ্যে হেদায়েত সরদার রানা ও ফজর আলী খাঁ মিলে শিশু পার্কের সামনে প্রায় ৭০টি দোকান আর অন্যরা একেকজন পাঁচ থেকে ১০টি করে দোকান বসিয়েছেন। এ ছাড়া এই সিন্ডিকেট পার্কের ভেতরে ভ্রাম্যমাণ হকার বসিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারে না ডিএসসিসির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আবার কিছু ক্ষেত্রে এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে শিশু পার্কের দায়িত্বে থাকা কেয়ারটেকার শফিউদ্দিনসহ কয়েকজনের যোগসাজশ রয়েছে।

শিশু পার্ক ও সংলগ্ন এলাকার লোকজনের সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সরকার প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর শিশু পার্ক এলাকায় অনেকটা ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন হেদায়েত সরদার রানা। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন ফজর আলী খাঁ। এরপর তাঁরা দুজন মিলে শিশু পার্কের সামনের ফাঁকা জায়গায় কমপক্ষে ৭০টি দোকান বসিয়ে তা ভাড়া দেন। প্রতিটি দোকান থেকে মাসিক ভাড়া আদায় করা হয় দুই হাজার টাকা। সেই হিসাবে প্রতি মাসে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা আর বছর হিসাবে তা দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার টাকায়। এ দুজনের পর বাচ্চু মোল্লা, রাজু, রাসেল, মিজান ও জুয়েলও অবৈধ দোকান বসিয়ে তা ভাড়া দিয়েছেন। বর্তমানে পুরো এলাকায় কমপক্ষে ২৮০ থেকে ৩০০ অবৈধ দোকান রয়েছে। এসব দোকানের জন্য পার্ক এলাকায় হেঁটেও দর্শনার্থীরা চলাফেরা করতে পারে না। পুলিশ কন্ট্রোল রুমের সামনে সরকারি জায়গা দখল করে ১৭টি দোকান করা হয়েছে। প্রতিটি দোকান থেকে পাঁচ লাখ টাকা জামানত এবং ১০ হাজার টাকা মাসিক ভাড়ায় দেওয়া হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতি মাসে ভাড়া আসে এক লাখ ৭০ হাজার টাকা। এসব দোকান ভাড়া দিয়েছেন বাহালুল মজনু চুন্নু।

এদিকে অবৈধ দখল আর চরম অব্যবস্থাপনায় অনেকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে শিশু পার্ক। ১৯৯২ সালে নভোযান ও উড়ন্ত বিমান ক্রয় করার পর আর কোনো রাইড আসেনি। এই ২৫ বছরের মধ্যে বেশ কয়েকটি রাইড বিকল হয়ে গেছে। বর্তমানে মাত্র ১০টি রাইড দিয়ে চলছে শিশু পার্ক।

গতকাল শিশু পার্কে গিয়ে দেখা যায় রোমাঞ্চ চক্র নামের রাইডটি বিকল হয়ে পড়ে আছে। ঈদের ছুটিতে হাজার হাজার শিশুর জন্য মাত্র ১০টি রাইড। ফলে এখানে ঘুরতে এসে অনেকেই হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছে। শিশু পার্কের দায়িত্বে থাকা ডিএসসিসির উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, ‘এবারের ঈদে দর্শনার্থী উপস্থিতি বেশ ভালো। ঈদের দিন প্রায় ৪০ হাজার, দ্বিতীয় দিন ৪৯ হাজার, তৃতীয় দিন ৪৭ হাজার ও চতুর্থ দিন ৪০ হাজার দর্শনার্থী এসেছে। আমাদের বিকল হয়ে যাওয়া রাইডটি মেরামত করা সম্ভব না। এটি নিলামে বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু করেছি। ’

শিশু পার্কের সার্বিক বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মো. বিলাল বলেন, ‘এ মুহূর্তে শিশু পার্কের কোনো ধরনের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম আমরা করতে পারছি না। কারণ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ পুরো এলাকা ঘিরে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় একটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমেই সব ধরনের কার্যক্রম হবে। এ ছাড়া পার্কের বাইরের অংশে আমরা একাধিকবার অবৈধ দখলমুক্ত করেছি। কিন্তু দখলদাররা আবারও সেখানে বসে পড়েছে। ’

Facebook Comments
,