সেন্টমার্টিন কে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন

যারা সেন্টমার্টিন যাবেন বা গিয়েছেন-
আমরা সবাই দ্বীপের সৌন্দর্য দেখতে যাই এবং দেখে ফিরে আসি। কিন্তু সেখানে মুদ্রার আরেক পিঠ আছে। আমি এর আগে দ্বীপের পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলাম। আপনাদেরকে আরেকটা কথা জানাই। দ্বীপে একটিমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়। তাতে চারশ শিক্ষার্থী আছে। আর শিক্ষক মাত্র ২ জন। ২ জন শিক্ষক চারশ শিক্ষার্থীকে লেখাপড়া সঠিকভাবে শেখাবে এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা অনিয়মিত। যদি একদিন কোনো শিক্ষক ছুটিতে থাকেন। এই চারশ ছেলেমেয়েকে নিয়ে বাকী একজন শিক্ষকের কি অবস্থা হয় ভেবে দেখুন। ফলে শিক্ষার্থীরাও অনিয়মিত। শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত। এবং সঠিক শিক্ষা পাওয়া থেকে বঞ্চিত। মাদ্রাসা আছে। অন্য শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসায় যায়। এরপরও আরো শতকরা ২০ ভাগ শিশু স্কুল বা মাদ্রাসায় যায়না। যাদের সংখ্যা শ খানেক তো হতে পারে। দ্বীপে এখন রিসোর্ট এর সংখ্যা সম্ভবত ৮৫টি। সবাই সেখানে ব্যবসায় করতে যাচ্ছে। কিন্তু ব্যবসায়ের পাশাপাশি যদি সেখানকার শিক্ষা ও সামাজিক কাজে খরচ করতেন তাহলে সেটা অনেক কাজে লাগতো। কেউ যদি একটা স্কুল করার জন্য এগিয়ে আসতো। জমি নেয়া ও অন্যান্য ব্যাপারে সহযোগিতা করতে পারতাম। সেন্টসমাটিন দ্বীপের চেয়ারম্যান মেম্বারসহ বেশীরভাগ মানুষ আমাকে চেনে। আমি তাদের সাথে দ্বীপের উন্নয়ন নিয়ে বেশ কয়েকবার বসেছি। কথা বলেছি।


সেন্টমার্টিন দ্বীপের উন্নয়নে সরকারী বরাদ্দ অতি যৎসামান্য। ৮ থেকে ১২ ফুট চওড়া রাস্তা চলাচলে বেশ সমস্যা হয়। যারা গিয়েছেন তারা জানেন। একটি বাঁধের দাবী জানিয়ে আসছে দ্বীপবাসী গত ২০ বছর ধরে। এ ব্যাপারে এ যাবত কোনো সাড়া মেলেনি। আমাদের মন্ত্রী এমপি আমলারাও সেখানে যান আর প্রাকৃতিক সুন্দর দেখে খুশিমনে ফিরে আসেন।
আশ্চয্যের ব্যাপার হলো সেখানে হোটেল রিজোর্ট এবং শিপিং কোম্পানীগুলো কোটি কোটি টাকা কামালেও। সেখান থেকে সরকারের আয় একবারেই যৎসামান্য। ঘাট ইজারার ২/৪ লাখ টাকা আর রিসোর্ট এর ট্রেড লাইসেন্স এর ৫০০ টাকা। সেখানকার কোনো রিসোর্ট ভ্যাট ট্যাক্স দেয় বলে আমার জানা নেই। তাছাড়া সেখানে ৫০টির বেশী রিসোর্ট অবৈধ। সম্ভবত সেখান থেকে সরকারী খাতায় আয় কম বলে সেখানে বরাদ্ধ কম হয়ে থাকতে পারে।


পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দ্বীপে প্রবেশের জন্য টিকেট কাটতে হয়। এখানে যদি যাত্রীপ্রতি ৫০-১০০ টাকা উন্নয়ন ও পরিবেশ ফি আদায় করা হয়। সে টাকা দিয়ে দ্বীপের উন্নয়ন করে আরো উদ্বৃত্ত থেকে যাবে। কারণ প্রতিদিন গড়ে ২০০০ লোক সিজনে। অফসিজনে ৫০০ থেকে ১০০০ লোক দ্বীপে যায়। এরা জনপ্রতি গড়ে ৩ থেকে ৫ হাজার কেউ কেউ আরো বেশী টাকা খরচ করেন। তাদের পক্ষে ১০০ বা ৫০ টাকা দেয়া কোনো ব্যাপার নয়। প্রয়োজন শুধু উদ্যোগের। এটা বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন করতে পারে। করতে পারে স্থানীয় প্রশাসনও।
সেন্টমাটিনি দ্বীপকে নিয়ে একটা মাস্টার প্লান করা হবে। সেজন্য এখন আর কোনো কিছু করা হচ্ছে না। কিন্তু ততদিনে এখানকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে বলে আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এবার ভাবুন ২ হাজার লোক আমরা যদি একটা করে পানির বোতল সেখানে রেখে আসি। প্রতিদিন কি পরিমাণ ময়লা হচ্ছে। বছরে এর পরিমাণ কত দাঁড়ায়। এখনো দ্বীপ থেকে ময়লা ও উচ্ছিষ্ট অপসারনের কোনো উদ্যোগও নেয়া হয়নি। আমরা যারা দ্বীপ দেখে মুগ্ধ হয়। তারাতো কিছু করতে পারি। আসুন কি করা যায় তা নিয়ে বসি এবং ভাবি। আমি সেখানকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে বসেছি। তারা এতই সাধারণ মানুষযে সরকারের নির্দেশনার বাইরে কোনো কাজ করা যায় এটা তারা ভাবতেই পারে না। রীতিমত ভয় পায় বলতে পারেন। আমার বন্ধু হাবিব ভাই দ্বীপের ২ নং ওয়ার্যড এর মেম্বার। তিনি একমাত্র ব্যতিক্রম। কিন্তু একা একজন মানুষ স্রোতের উল্টোদিকে কতটা কি করতে পারে বলুন?
যারা ভবিষ্যতে যাবো তারা দুটো কাজ করতে পারি একটা হলো শিশুদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য কিছু করা আরেকটা হলো। যেসব নোংরা ময়লা আবর্জনা দ্বীপে ফেলা হচ্ছে সেগুলো থেকে দ্বীপকে বাঁচানোর জন্য জনসচেতনতা তৈরী করা।


কিছু আশার কথা হচ্ছে। সেখানে যাওয়ার ব্যাপারে পরিবেশবাদী সংগঠনগলো সরকারের কাছে দাবী জানিয়ে আসছে। যে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশী মানুষ যেন দ্বীপে যেতে না পারে। আগামী তিন বছরের মধ্যে সরকার এই বিষয়ে একটা নির্দেশনা দিবে বলে আশা করা যায়। এর মধ্যে ৩৫টি হোটেল ভাঙ্গার জন্য আদালত নির্দেশ দিয়েছে। যদিও জনবল এর অভাবে প্রশাসন তা বাসস্তবায়ন করছেনা।
এদিকে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বলছে। দ্বীপের আশপাশে সমুদ্রের তলায় এবং নাফ নদী ও নদীর চ্যানেলে যে অনন্যসুন্দর জীববৈচিত্র রয়েছে সেটা হুমকীর মুখে রয়েছে অনিয়ন্ত্রিত জাহাজ চলাচল এবং বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ বেশী পরিমানে ধরার কারণে। আর বেশী বেশী বোট চলাচল এবং ময়লা উচ্ছিস্টতো রয়েছেই।
।ছবি: পরিবেশ দূষনের ফলে দ্বীপে মরে থাকা ক্যাটফিশ। প্রবাল পাথরের খাঁজে খাঁজে ময়লা।

Facebook Comments