গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সৌদি এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে

রিপ্লেসমেন্ট বন্ধ রেখে হাতেগোনা কয়েকটি এজেন্সির কাছে হজে যাওয়ার বিমান টিকিট দিয়ে সিন্ডিকেট ব্যবসার সুযোগ করে দেয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সৌদি এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

সূত্রমতে, চলতি বছর সৌদি এয়ারলাইন্স তাদের ৬৫ হাজার টিকিটের মধ্যে প্রায় ২৫ হাজারই শানসাইন এক্সপ্রেসকে, আল গাজী ট্রাভেলসকে ১০ হাজার ও কাজী এয়ারকে ৮ হাজার টিকিট দিয়েছে। বাকি ২২ হাজার ২৭টি এজেন্সিকে দেয়া হয়েছে। এতে ওই তিনটি এজেন্সি টিকিটপ্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বাড়তি দামে বিক্রি করেছে। সে হিসাবে প্রায় ৪০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এ সিন্ডিকেট।

এদিকে যাত্রী সংকটের কারণে এখন পর্যন্ত ২৮টি হজ ফ্লাইট বাতিল করেছে বিমান বাংলাদেশ ও সাউদিয়া এয়ারলাইন্স। এর মধ্যে বিমানের ২৪টি ও সাউদিয়ার ৪টি। এজেন্সি মালিকদের সংগঠন হজ এজেন্সি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) নেতারা বলছেন, ফ্লাইট বিপর্যয়ের নেপথ্যে টিকিট সিন্ডিকেটের কারসাজি রয়েছে। এ কারসাজির কারণেই বিমানের হজ ফ্লাইটগুলো বাতিল হয়েছে। এতে শুধু বিমানেরই প্রায় ৬০ কোটি টাকা গচ্চা গেছে। তবে এ নিয়ে পরিচয় প্রকাশ করে হাবের কোনো নেতা কথা বলতে রাজি হননি। এ বিষয়ে হাবের একজন শীর্ষ নেতা যুগান্তরকে বলেন, এবার বিপুলসংখ্যক হজ ফ্লাইট বাতিলের মূল কারণ টিকিট সিন্ডিকেট। এ কারণেই ফ্লাইট বিপর্যয়। এ সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেও তাদের বিরুদ্ধে বিমান মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টরা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

জানা গেছে, চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে মোট ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জনকে পবিত্র হজ পালনের অনুমতি দিয়েছে সৌদি সরকার। প্রচলিত নিয়মানুসারে মোট হজযাত্রীর শতকরা ৫০ ভাগ রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং অবশিষ্ট যাত্রী সৌদি এয়ারলাইন্স পরিবহন করবে। বাংলাদেশে শত শত ট্রাভেল এজেন্সি হজ কার্যক্রমে জড়িত থাকলেও সম্প্রতি সৌদি এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ মাত্র ৩০টি এজেন্সিকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রায় ৬৫ হাজার টিকিট বিক্রির অনুমতি দিয়েছে। মূলত বছরব্যাপী ওমরাহ, লেবার ও ভিজিট ভিসার যাত্রীদের কাছে টিকিট বিক্রির অনুপাতে হজের আগে প্রধান ৩০টি এজেন্সির তালিকা করে সৌদি এয়ারলাইন্স। অর্থাৎ কোনো এজেন্সি যদি সারা বছর মোট এক কোটি টাকার টিকিট বিক্রি করে তাহলে সে হজের ২০ শতাংশ টিকিট বিক্রির জন্য পাবে। যদিও এ ব্যাপারে অন্ধকারে থেকে যায় এজেন্সি মালিকরা। কারণ তারা জানে না কোন কোন এজেন্সি ওই তালিকায় স্থান পায়। এ বছরও একই অবস্থা। অভিযোগ উঠেছে, চলতি বছর সৌদি এয়ারলাইন্স তাদের ৬৫ হাজার টিকিটের মধ্যে প্রায় ২৫ হাজারই শানসাইন এক্সপ্রেস, আল গাজী ট্রাভেলসকে ১০ হাজার ও কাজী এয়ারকে ৮ হাজার টিকিট দিয়েছে। বাকি ২২ হাজার টিকিট ২৭টি এজেন্সিকে দিয়েছে বলে জানা গেছে।

এছাড়া আগে বুকিং দেয়া টিকিট রিপ্লেসমেন্ট (প্রতিস্থাপন) করতে চাইলে ৩শ’ ডলার জরিমানা দিতে হয়। গত ১৮ আগস্ট সৌদি এয়ারলাইন্স সংশ্লিষ্ট এজেন্সি মালিকদের কাছে একটি ই-মেইল বার্তা পাঠিয়ে রিপ্লেসমেন্ট বন্ধের ঘোষণা দেয়। কিন্তু তাদের পছন্দের দু’তিনটি এজেন্সিকে অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে গোপনে রিপ্লেসমেন্টের সুবিধা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে সৌদি এয়ারের কান্ট্রি ম্যানেজার রিয়াদ আল হোতাইফ, স্টেশন ম্যানেজার মোহাম্মদ সালেহ এবং সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং ম্যানেজার ওমর খৈয়ামের সহযোগিতায় শানসাইন এক্সপ্রেসের মিজানুর রহমান, আল গাজী ট্রাভেলসের হাসান মোহাম্মদ রাতারাতি বাতিল হওয়া টিকিটগুলোর রিপ্লেসমেন্ট সুবিধা আদায় করেছে। এখন শেষ মুহূর্তের টিকিট-স্বল্পতার সুযোগে টিকিটপ্রতি ৮-১০ হাজার টাকা বেশি নিয়ে বিক্রি করার অভিযোগ করেছেন অনেক এজেন্সি। এ বছর প্রতিটি এজেন্সি গড়ে ২-৩ হাজার করে টিকিট বিক্রির সুযোগ পেলেও শানসাইন এক্সপ্রেস ইতিমধ্যে একাই ১৮ হাজার টিকিট বিক্রি করেছে। রিপ্লেসমেন্টের সুযোগ নিয়ে আরও কয়েক হাজার টিকিট হাতিয়ে নিয়েছে বলে জানা গেছে।

সৌদি এয়ারের কান্ট্রি ম্যানেজার হোতাইফ এখন সৌদি আরবে থাকায় যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। স্টেশন ম্যানেজার সালেহ ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। সেলস ম্যানেজার ওমর খৈয়ামকে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। প্রতিবেদকের পরিচয় জানিয়ে এসএমএস পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

এদিকে হজযাত্রীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভিসা না করিয়ে প্রতারণার অভিযোগে মঙ্গলবার হজ অফিস ৩টি হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ তিনটি এজেন্সি হল- ইউরেশিয়া ট্রাভেল, নিবির ট্রাভেল অ্যান্ড টুর এবং ইকো হজ এজেন্সি। অভিযোগ রয়েছে, এ তিনটি হজ এজেন্সি হজযাত্রীদের কাছ থেকে ৪০-৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এ কারণে ২-৩শ’ হজযাত্রী টাকা দিয়েও হজে যেতে পারছেন না। হজ অফিসার সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এ তিনটি এজেন্সির অ্যাকাউন্টধারী ব্যাংকগুলোকে আজ চিঠি দিয়ে সতর্ক করে দেয়া হবে, যাতে টাকা উঠাতে না পারে।

এদিকে ভিসা হওয়ার পরও ৩১ হাজার ৭৮৩ জন হজযাত্রী জেদ্দা যেতে পারেননি। ২৭ আগস্ট শেষ হচ্ছে হজ ফ্লাইট। হজ অফিস বলছে, সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ যদি হজ ফ্লাইটের সময়সীমা না বাড়ায় তাহলে কমপক্ষে ৪ হাজার হজযাত্রীর হজে যেতে সমস্যা হবে। মঙ্গলবার পর্যন্ত বিমান ও সাউদিয়া এয়ারলাইন্স ৯৪ হাজার ৪১০ জন হজযাত্রী সৌদি আরব নিয়ে গেছে। এর মধ্যে বিমান ৪৬ হাজার ১৭০ জন আর সাউদিয়া এয়ারলাইন্স ৪৮ হাজার ২৪০ জন পরিবহন করেছে। বিমান বলছে, তারা যদি অতিরিক্ত স্লট পায় তারপরও এয়ারক্রাফটের অভাবে ২ হাজারের মতো হজযাত্রী পরিবহন করতে পারবে না। এদিকে থার্ড ক্যারিয়ার দিয়ে অতিরিক্ত হজযাত্রী পরিবহনের সিদ্ধান্ত হলেও এখন পর্যন্ত এরকম কোনো এয়ারলাইন্স জোগাড় করতে পারেনি বিমান। জানা গেছে, এ মুহূর্তে কোনো এয়ারলাইন্সেরই অতিরিক্ত এয়ারক্রাফট নেই। খোদ সাউদিয়া এয়ারলাইন্সকেও এবার ২ হাজারের মতো হজযাত্রী পরিবহনে হিমশিম খেতে হবে।

Facebook Comments