রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়টি নিঃসন্দেহে এক সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলায়তন ভেঙে বর্তমানে ক্ষমতার মসনদে যাওয়ার যে দৌড় শুরু হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের অবস্থানকে কেবল ‘অংশগ্রহণকারী’ হিসেবে নয়, বরং ‘একক ও অপ্রতিরোধ্য শক্তি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। দলটির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নেওয়া কৌশলগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা সনাতনী রাজনীতির খোলস ছেড়ে ‘স্মার্ট ও পলিসি-ওরিয়েন্টেড’ রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে।
তৃণমূলে আগাম বার্তা: প্রার্থীর নাম ঘোষণা ও মাঠ দখল বিএনপির হাইকমান্ডের সবচেয়ে বড় কৌশলগত চাল হলো নির্বাচনের ঢের আগেই ২৩৬টি আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা। এটি দ্বিমুখী সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করেছে। প্রথমত, এর মাধ্যমে দলীয় কোন্দল নির্বাচনের চূড়ান্ত মুহূর্ত পর্যন্ত জিইয়ে না রেখে আগেই মিটিয়ে ফেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, সম্ভাব্য প্রার্থীরা এখন আর ড্রইংরুমের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই; তারা ক্ষেত-খামার থেকে টং দোকান—সর্বত্র চষে বেড়াচ্ছেন। এটি কেবল জনসংযোগ নয়, বরং মাঠপর্যায়ে ধানের শীষের মনস্তাত্ত্বিক বিজয় নিশ্চিত করার এক ব্লু-প্রিন্ট।
‘আন্দোলন’ থেকে ‘রাষ্ট্রগঠন’: ৩১ দফার রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিং দীর্ঘদিন রাজপথের আন্দোলন করা একটি দল যখন হঠাৎ ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ নিয়ে কথা বলে, তখন বুঝতে হবে তারা ক্ষমতায় যাওয়ার ব্যাপারে কতটা আত্মবিশ্বাসী। বিএনপির ৩১ দফা রূপরেখা কেবল একটি ইশতেহার নয়, বরং এটি তাদের ‘ছায়া সরকার’ পরিচালনার একটি দলিল। কৃষি, শিক্ষা, ফ্যামিলি কার্ড কিংবা যুবকদের কর্মসংস্থান—এই বিষয়গুলোকে সামনে এনে দলটি বোঝাতে চাইছে, তারা কেবল বিরোধিতার খাতিরে রাজনীতি করছে না, বরং রাষ্ট্র মেরামতের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তাদের হাতে আছে। আগামী ৭ ডিসেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া ৬ দিনের ‘ইনডোর’ কর্মসূচি মূলত এই রোডম্যাপকে সাধারণ মানুষের মগজে গেঁথে দেওয়ারই মহড়া।
অভ্যন্তরীণ তোষণ নীতি: বহিষ্কৃতদের ঘরে ফেরা রাজনীতিতে সংখ্যাতত্ত্ব একটি বড় ফ্যাক্টর। গত কয়েকদিনে তিন শতাধিক বহিষ্কৃত নেতাকর্মীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে বিএনপি প্রমাণ করেছে, এই মুহূর্তে তারা কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। ‘জিরো টলারেন্স’ থেকে সরে এসে ‘জিরো রিস্ক’ পলিসিতে হাঁটছে দলটি। দলের ভেতরে ক্ষোভ প্রশমন এবং সবাইকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা মূলত ‘গণজোয়ার’ সৃষ্টির পূর্বশর্ত। দলটির নীতিনির্ধারকরা জানেন, প্রতিপক্ষ দুর্বল হলেও নির্বাচনের মাঠে নিজ দলের বিদ্রোহ বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
তরুণ তুর্কি ও নতুন ভোটার: আসল টার্গেট রুহুল কবির রিজভী এবং দলীয় হাইকমান্ডের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, তাদের মূল বাজি ‘চব্বিশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী তরুণ প্রজন্ম’। ২০০৪ সালের পর বিএনপি যে রাজনৈতিক কৌশল পরিবর্তন করেছে, তার মূল নির্যাস হলো—জনগণকে শুধু মিছিলে নয়, ব্যালট বক্সেও প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব উপস্থিতি এবং ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমে তারা নতুন ভোটারদের কাছে নিজেদের ‘রিলাইয়েবল’ বা নির্ভরযোগ্য শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
উপসংহার: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা দৃশ্যত মনে হচ্ছে, বিএনপি একটি ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালকে তারা নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করার ‘গোল্ডেন পিরিয়ড’ হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে, ধানের শীষের এই ‘গণজোয়ার’ তৈরির স্বপ্নে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং ভূ-রাজনীতির অদৃশ্য সমীকরণ।
বিএনপি কি পারবে দীর্ঘদিনের ক্ষমতার বাইরে থাকার ক্লান্তি মুছে একটি আধুনিক, জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে? নাকি অতীতের মতোই কোনো অদৃশ্য বাধায় এই গণজোয়ার থমকে যাবে? উত্তর মিলবে আগামী দিনগুলোর রাজনৈতিক দাবা খেলায়। তবে এটুকু নিশ্চিত—বিএনপি এবার ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কোনো ‘শর্টকাট’ নয়, বরং জনসম্পৃক্ততার দীর্ঘ পথই বেছে নিয়েছে।